• [english_date] , [bangla_date] , [hijri_date]

যাদুকাটা নদীর পাড় কাটা বন্ধে ইজারাদারের বাশেঁর বেড়া।

bilatbanglanews.com
প্রকাশিত July 20, 2026
যাদুকাটা নদীর পাড় কাটা বন্ধে ইজারাদারের বাশেঁর বেড়া।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, ঐতিহ্যবাহী শিমুল বাগান সংরক্ষণ এবং সীমান্ত নদী যাদুকাটার পাড় কাটা রোধে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে প্রশাসন ও ইজারাদার কর্তৃপক্ষ। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বালু উত্তোলনের পাশাপাশি নদীর ইজারা বহির্ভূত এলাকা ও তীরবর্তী জনপদ রক্ষায় ইজারাদারের পক্ষ থেকে লাল সতর্কবার্তা ও সীমানা নির্ধারণী বেড়া দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় একটি চক্রের অবৈধ বালু উত্তোলন এবং আইনি কিছু দুর্বলতার কারণে যাদুকাটা নদীর পাড় ধস ও পরিবেশ দূষণ পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

 

নদীতে সনাতন (ম্যানুয়াল) পদ্ধতিতে কর্মরত বালু শ্রমিক মো: রমজান আলী, বাসু মিয়া ও মো: একলাস নূর জানান, তারা ইজারাদারের নির্ধারিত সীমানার ভেতর থেকে সনাতন পদ্ধতিতে বালু তুলে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু একটি চক্র রাতের আঁধারে নিষিদ্ধ ড্রেজার ও বোমা মেশিন ব্যবহার করে নদীর তলদেশ ও পাড় কাটছে। এর ফলে নদীর উপর নির্মানাধীন সেতু ও শিমুল বাগান ধসের ঝুঁকিতে পড়ছে এবং সাধারণ শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়েছে। তারা অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানান।

 

সম্প্রত যাদুকাটা ১ ও ২ নম্বর মহালে দেখা গেছে, ইজারাদারের পক্ষ থেকে বাঁশ দিয়ে নদীর পাড় এলাকায় বেড়া দেওয়া হয়েছে এবং বড় বড় ব্যানার ও ফেস্টুনে সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে।

 

 

ইজারাদার প্রতিনিধি মো: লোকমান মিয়া ও সাজ্জাদ মিয়া জানান, ইজারাকৃত সীমানার বাইরে গিয়ে শিমুল বাগান ও ঘাগটিয়ার পাড় কাটা রোধে তারা বহুবার বাধা দিয়েছেন। যাদুকাটা ১ ও ২-এর ইজারাদার শাহ্ রুবেল বলেন-আমরা সরকারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব দিয়ে নিয়ম মেনে মহাল ইজারা নিয়েছি। কিন্তু একটি চক্র অবৈধভাবে পাড় কেটে আমাদের ব্যবসার ভাবমূর্তি নষ্ট করছে এবং শিমুল বাগান ধ্বংস করছে। আমরা নিজস্ব খরচে নদীর পাড়ে বেড়া দিয়েছি এবং পাহারাদার বসিয়েছি। প্রশাসনকে অনুরোধ করেছি যেন রাতের আঁধারে যারা ড্রেজার চালায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

 

অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের দমনে পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতার কথা উল্লেখ করে পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন (পিপিএম) বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন থেকে ইজারা দেওয়া এই বালুমহালের কিছু শর্ত ইজারাদাররা মানছেন, আবার কিছু মানছেন না। নদীর তীর কাটা ও অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে পুলিশ প্রতিনিয়ত মামলা দিচ্ছে। গত জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ৬৬টি মামলায় ৭২০ জনকে আসামি করা হয়েছে এবং ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

 

তবে মূল সমস্যাটি তুলে ধরে তিনি বলেন, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ (সংশোধনী ২০২৩)’ অনুযায়ী এই অপরাধটি জামিনযোগ্য (Bailable)। ফলে আসামিদের আদালতে পাঠানো হলেও তারা দ্রুত জামিনে বের হয়ে আসে এবং জব্দকৃত মালামাল বা নৌযান নিয়ে আবারও একই অপরাধে লিপ্ত হয়।

 

তিনি আরও যোগ করেন, এটি বন্ধ করতে টাস্কফোর্স ও মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে অবৈধ নৌযানগুলো স্পটেই ধ্বংস করা প্রয়োজন, যাতে অপরাধীরা বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। পাশাপাশি, ইজারাদাররা যদি রাতে বালু কাটা সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে কেবল সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কাজ পরিচালনা করেন, তবে এই মহালে দ্রুত শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

 

সার্বিক বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, যাদুকাটা নদী পরিবেশগত সম্পদ ও একটি বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র। অবৈধভাবে যেন কেউ নদীর পাড় কাটতে না পারে, সেজন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসন প্রতিনিয়ত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও মামলা করছে।

 

তিনি আরও বলেন,আইনের প্রয়োগ ও প্রশাসনের অভিযানের পাশাপাশি প্রথম প্রতিরোধটা আসতে হবে স্থানীয়দের কাছ থেকে। স্থানীয় সচেতনতা ছাড়া প্রশাসনের একার পক্ষে বিষয়টি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ইজারাদারদের বেড়া দেওয়ার উদ্যোগকে প্রশাসন স্বাগত জানায় এবং পরিবেশ ধ্বংসকারী যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসন শতভাগ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অটল রয়েছে।

 

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং ইজারাদারের মাঠপর্যায়ের উদ্যোগের পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলেই কেবল যাদুকাটা নদী ও ঐতিহ্যবাহী শিমুল বাগানকে সম্পূর্ণ রক্ষা করা সম্ভব হবে।