সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জ জেলার সাচনা বাজার ও জামালগঞ্জ সড়কের দুই পাশের সাড়ে চার হাজার গাছ কাটা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। গাছ কাটার প্রতিবাদে পরিবেশ বাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে মানববন্ধন সহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালিত হয়েছে। অবিলম্বে গাছ কাটা বন্ধের আলটিমেটাম ও দেয়া হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গাছ কাটা বন্ধের নির্দেশ দিলেও বন বিভাগ তা কর্নপাত না করে গাছ কাটা অব্যাহত রেখেছে। জেলা প্রশাসন ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে।
গত কয়েকদিন ধরেই সাচনা জামালগঞ্জ সড়কের দুই পাশে লাগানো সবুজ সারি সারি গাছ কাটা হচ্ছে। বিষয়টি এলাকাবাসীর নজরে এলে তারা এর প্রতিবাদ করেন। পরিবেশ বাদী সংগঠন হাওর ও নদী রক্ষ
আন্দোলনের পক্ষ থেকে মানববন্ধন করা হয়। মানববন্ধন থেকে আলটিমেটাম দেয়া হয় অবিলম্বে গাছ কাটা বন্ধ না করলে কঠোর আন্দোলনের ডাক দেয়া হবে। সেই সাথে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারক লিপি ও প্রদান করা হয়। জেলা প্রশাসন গাছ কাটা বন্ধ রাখার জন্য নির্দেশ দিলেও বন বিভাগ তা কর্নপাত না করে গাছ কাটা অব্যাহত রেখেছে। ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা জানিয়েছেন।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) একং বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জের আব্দুজ জহুর সেতু থেকে জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজার পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৯ কিলোমিটার। টুকের বাজার, গৌরারং, ইচ্ছারচর, বেড়াজালি, ইসলামগঞ্জ, আহমদাবাদ, নিয়ামতপুর, শালমারা, কলায়া, দুলবারচর, সংগ্রামপুর, শেরমস্তপুর, নজাতপুর, কুকড়াপশী, ভরতপুরসহ পুরো সড়কের দুই পাশে রয়েছে সবুজ সারি সারি গাছ।
সরকারি নথি অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের সংখ্যা মোট চার হাজার ৮৮৪।
এর বাইরে জ্বালানি কাঠ হিসেবে ২২৬টি গাছের কথা উল্লেখ রয়েছে।
সুনামগঞ্জ বন বিভাগ বলছে, ২০০৩-২০০৪ সালে সামাজিক বনায়নের আওতায় এসব গাছের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তা কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অনেক গাছ মারা যাচ্ছে এবং পরিপক্ব গাছ নিয়ম অনুযায়ী নিলামে বিক্রি করা হয়েছে।
এদিকে সড়কের গাছ কাটার এই কারণ নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন। বন বিভাগের পক্ষ থেকে সড়ক সম্প্রসারণের কথা বলা হলেও সওজের পক্ষ থেকে ওই সড়ক সম্প্রসারণের কোনো চলমান প্রকল্প না থাকার কথা জানানো হয়েছে।
ফলে গাছ কাটার পেছনে প্রকৃত কারণ কী, তা নিয়ে চলছে আলোচনা।
স্থানীয় উপকারভোগীদের অভিযোগ, কয়েক কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি করা হয়েছে। তাদের দাবি, গাছগুলো আরো কয়েক বছর রাখা হলে সরকারি সম্পদ থেকে বেশি রাজস্ব পাওয়া সম্ভব ছিল। একই সঙ্গে সামাজিক বনায়ন বিধিমালা অনুযায়ী উপকারভোগীরাও বেশি অর্থ পাওয়ার সুযোগ পেতেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাছ কাটার উদ্যোগ এবারই প্রথম নয়। ২০২৪ সালের মার্চেও সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়কের গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ওই সময় গাছের গায়ে লাল কালিতে নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। গাছ বিক্রির জন্য দরপত্র আহ্বানেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু স্থানীয়দের প্রতিবাদ ও গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সেই উদ্যোগ স্থগিত রাখা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এবার কৌশল বদলে সুনামগঞ্জ জেলা শহরের অংশ বাদ দিয়ে জামালগঞ্জ-ধর্মপাশা উপজেলায় সংযোগ উড়াল সড়কের জন্য সড়ক প্রশস্ত করার দোহাই দিয়ে জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজার অংশ থেকে গাছ কাটার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সড়কের দুই পাশে রয়েছে রেইনট্রি, কড়ই, আকাশমণি, অর্জুন, মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় স্থানীয় উপকারভোগীদের পরিচর্যায় বেড়ে ওঠা এসব গাছ দীর্ঘদিন ধরে পথচারীদের ছায়া দেওয়ার পাশাপাশি পাখির আবাসস্থল হিসেবেও ভূমিকা রাখছিল।
এ বিষয়ে জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজারের বাসিন্দা মো. খুরশিদ মিয়া বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে সারা দেশে গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছেন, সেখানে সুনামগঞ্জ বন বিভাগ গাছ কাটার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের নীতির সাংঘর্ষিক বলে আমি মনে করি।’
সুনামগঞ্জ বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘সামাজিক বনায়নের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় গাছগুলো কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ তিনি জানান, জামালগঞ্জ অংশের গাছ বিক্রি হয়েছে ৫৬ লাখ ৪৪ হাজার টাকায়। সদর অংশের গাছ বিক্রি হয়েছে ২৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকায়। দুই অংশ মিলিয়ে গাছগুলোর বিক্রয়মূল্য ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
রেঞ্জ কর্মকর্তা আরো বলেন, সামাজিক বনায়ন বিধিমালা অনুযায়ী বিক্রির অর্থের ৫৫ শতাংশ পাবেন উপকারভোগীরা। বন অধিদপ্তর পাবে ১০ শতাংশ, ভূমির মালিক হিসেবে সওজ পাবে ২০ শতাংশ এবং ইউনিয়ন পরিষদ পাবে ৫ শতাংশ। অবশিষ্ট ১০ শতাংশ দিয়ে নতুন করে গাছ লাগানো হবে।
রেঞ্জ কর্মকর্তার ভাষ্য, বন বিভাগের তালিকাভুক্ত টাঙ্গাইলের দুটি, সিলেটের একটি ও দোয়ারাবাজারের একটি—মোট চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গাছ কাটার কার্যাদেশ পেয়েছে। নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই গাছগুলো বিক্রি করা হয়েছে।
পরিবেশ কর্মী হাউস এর নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন বর্তমান বাজারমূল্যে এই গাছের মূল্য কয়েক কোটি টাকা হলেও নাম মাত্র মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। বিষয়টি সঠিক তদন্ত করে উদঘাটন করতে হবে।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি রাজু আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন অভিযোগ করেন রাতের আঁধারে কাউকে কিছু না জানিয়ে গাছ কাটার রহস্য উদঘাটন করা জরুরী।
আমরা এর প্রতিবাদ জানালে জেলা প্রশাসন গাছ কাটা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্ত তার পর ও থেমে নেই। আমরা কঠোর আন্দোলনের ডাক দেব শীঘ্রই।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আহাদ উল্লাহ বলেন, ‘সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়ক প্রশস্ত করার কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি। গাছ কাটার বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কিছু জানা নেই। বন বিভাগ থেকে গাছ কাটার একটি দরপত্রের কপি শুধু তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান বলেন, ‘বর্তমান জেলা প্রশাসকের দায়িত্বকালে, অর্থাৎ গত তিন-চার মাসে এ ধরনের কোনো অনুমোদন হয়নি। ঘটনা অনুসন্ধানের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তপুর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।