বিবিএন ডেস্ক:
১৯৫৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী আলতাব আলী সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার সৈয়দরগাঁও ইউনিয়নের মোল্লাআতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা হাজী আব্দুস সামাদ ও মা সোনাবান বিবি। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে আলতাব আলী ছিলেন সবার বড়। তিনি লেখাপড়া করেছেন মুল্লাআতা প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে।
আলতাব আলীর গ্রামের বাড়ি
১৯৬৯ সালে প্রবাসী চাচার সাহায্যে আলতাব আলী পাড়ি জমান বিলেতে। সেখানে তিনি থাকতেন পূর্ব লন্ডনের ওয়াপিংয়ে। বস্ত্র শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন বাংলা টাউনের ব্রিকলেন সংলগ্ন হানবুরি স্ট্রিটের একটি পোশাক কারখানায়। ১৯৭৫ সালে আলতাব আলী প্রথম বারের মতো দেশে গিয়ে বিয়ে করেন। নবপরিণীতা স্ত্রী জাহানারা বেগম কে নিজ বাড়িতে রেখে ছয় মাস পর আবারো জীবিকার তাগিদে ফিরে আসেন লন্ডনে। স্বপ্ন ছিল পরিবারকে অর্থনৈতিক মুক্তি দেবেন। প্রিয়তমা জীবন সঙ্গীকে নিয়ে আসবেন লন্ডনে। কিন্তু তার সে স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
১৯৭৮ সালের ৪ মে। সে দিন ছিল স্থানীয় সরকার নির্বাচন। কাজ শেষে বাজার করে বাসায় ফেরার পথে পূর্ব লন্ডনের এডলার স্ট্রিটে অজ্ঞাত কয়েকজন বর্ণবাদীর হাতে ২৫ বছর বয়স্ক আলতাব আলী নির্মমভাবে নিহত হন। তার ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল তিন শ্বেতাঙ্গ কিশোর- রয় আর্নল্ড, কার্ল লাডলো এবং আরেক কিশোর। আর্নল্ড আর লাডলোর বয়স ছিল ১৭। অন্যজন ছিল ১৬ বছরের কিশোর। তারা আলতাব আলীকে চিনতো না। অন্য বর্ণের মানুষকে মারাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।
বর্ণবাদীরা তখন শ্যামলা বর্ণের মানুষ দেখলে ‘পাকি’ বলে গালি দিত।গ্রেফতারের পর একজন ঘাতক কিশোর পুলিশকে বলেছিল, “আমরা পাকিদের দেখলে গালি দেই ,অর্থ নেই,মারধোর করি । আমি নিজেই অন্তত পাঁচবার পাকিদের মারধর করেছি।
মৃত্যুর এক মাস পর, দেশে আলতাব আলীর গ্রামের বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। নির্মম এই হত্যাকান্ড সেদিন গোটা বাংলাদেশি কমিউনিটিকে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছিল। দীর্ঘ দিন ধরে অত্যাচার সহ্য করে চলা মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছিল আলতাব আলীর তাজা রক্ত। অবশেষে বেঁচে থাকার জন্য লড়াইয়ে নামলে সেই সংগ্রামে বাংলাদেশিদের পাশে ছিলেন যুক্তরাজ্যের নিরীহ শ্বেতাঙ্গ, পাকিস্তানি, ভারতীয়, ক্যারিবীয় সকলেই।
আলতাব আলীর এলাকার নেতাদের সাথে কথা বলছেন লেখক
আলতাব আলীর মৃত্যুর দশ দিন পর, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সোচ্চার হয়ে প্রায় ৭ হাজার মানুষ তাঁর কফিন নিয়ে মিছিল করে। প্রথমে তারা যান লন্ডনের রাজপথ ধরে। কফিন কাঁধে মিছিল হাইড পার্ক, ট্রাফালগার স্কয়ার এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে পৌঁছায়। সেদিন ঐ বিশাল জনতার কণ্ঠে ছিল শ্লোগান ‘কৃষ্ণাঙ্গ-শ্বেতাঙ্গ এক হও এবং লড়ো’ – ‘ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট- ইউনাইট এন্ড ফাইট।‘ এই গণবিস্ফোরণ যূক্তরাজ্যে বর্ণবিদ্বেষী অবস্থার পরিবর্তনের সূচনা হয় ।
১৯৯৮ সালে আলতাব আলী হত্যাকাণ্ডের স্থান সেন্ট মেরিস পার্ককে ‘শহীদ আলতাব আলী পার্ক’ নামে নামকরণ করা হয়। ১৯৯৯ সালে আলতাব আলী পার্কের দক্ষিণ প্রান্তে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি শহীদ মিনার যা বাংলাদেশি ভাষা-শহীদদের স্মরণে বহির্বিশ্বে বানানো প্রথম শহীদ মিনার। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। পরবর্তীতে আলতাব আলী পার্ক সংলগ্ন বাস স্টপের নামকরণও করা হয় কালের সাক্ষী এই মানুষটির নাম।