সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জ জেলা জুড়েই অনলাইন জুয়ার বিস্তার লাভ করেছে। বর্তমানে এর ভয়াবহতা চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এই সর্বনাশা খেলায় কেউ কেউ একদম নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। আবার মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। যার ফলে চুরি ছিনতাই ও মাদকে ও আসক্ত হয়ে পড়েছেন। পুলিশ কিছু কিছু অভিযান চালালে ও তা থেমে নেই। ফলে সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
স্মার্টফোন ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবার সহজলভ্যতার কারণে অনলাইন জুয়ার বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
পৌর শহর থেকে শুরু করে জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ বাজার পর্যন্ত অর্থের বিনিময়ে অনলাইন বেটিং, লুডু বাজি ও বিভিন্ন জুয়ার অ্যাপস ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতে তরুণ ও যুব সমাজের একটি অংশ আসক্ত হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা।
মোবাইল ফোনভিত্তিক অ্যাপের মাধ্যমে এখন ক্রিকেট, ফুটবল, এভিয়েটর গেম, আইপিএল বেটিংসহ নানা খেলায় অর্থের বাজি ধরা হচ্ছে। এমনকি জনপ্রিয় লুডু খেলাও অনলাইন জুয়ার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। দিনের পর দিন টাকা দিয়ে লুডু খেলার প্রবণতা বাড়ছে। অভিভাবকদের দাবি, বিনোদন হিসেবে শুরু হলেও এটি ভয়াবহ আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে, এই অনলাইন জুয়ার আসর এখন শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ নেই গ্রামাঞ্চলের চায়ের দোকান, মুদি দোকান কিংবা মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের দোকানের ভেতরেও বসছে। বাইরে থেকে সাধারণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মনে হলেও ভেতরে মোবাইল ফোনের পর্দায় চলছে হাজার হাজার টাকার বাজি। দুপুরে চা খাওয়ার অজুহাতে, রাতে দোকান বন্ধের পরও নির্দিষ্ট কয়েকজন জড়ো হয়ে জুয়ার কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলে জানান স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব চলছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় অনেকে প্রথমে বন্ধু বা পরিচিতদের মাধ্যমে এসব অ্যাপে যুক্ত হন। শুরুতে সামান্য লাভ দেখালেও পরে অধিক লাভের আশায় বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে প্রচুর ক্ষতির মুখে পড়েন অনেকে। একপর্যায়ে ধারদেনা বা পরিবারের অজান্তে টাকা সংগ্রহ করে এসব কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। আবার মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ রাতারিতি গাড়ি বাড়ি ও ব্যাংক ব্যালেন্স করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন।
সমাজ কর্মী সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, অনলাইন জুয়ার কারণে অনেক পরিবার নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর দাবি, এলাকার কিছু স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানরা জুয়ার নেশায় বিপুল অর্থ হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছেন। কেউ কেউ ঋণের চাপ সামলাতে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, আবার কেউ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। তবে তাঁদের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝার চাপ পরিবারের ওপরই পড়ছে। আইন শৃংখলা বাহিনীর উচিত এসবের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার।
দিরাই সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, তরুণদের মধ্যে অনলাইন আসক্তি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি মনে করেন, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ প্রবণতা রোধ কঠিন।
সুনামগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি শামস শামীম বলেন, অনলাইন জুয়ার বিস্তার এখন সামাজিক সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। শুধু ব্যক্তি নয়, পরিবার ও সমাজও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন ও সমাজের সচেতন মহলের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
স্থানীয় সূত্র বলছে, জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে কিছু তরুণ চুরি, ছিনতাই এমনকি ডাকাতির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই, তবে বিষয়টি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয়দের দাবি, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে অনলাইন জুয়ার বিস্তার ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক ও অপরাধমূলক সংকট তৈরি করতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক অভিযোগ করেন সুনামগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকাতেই বড় বড় অনলাইন জুয়ার এজেন্ট রয়েছে। এদের মাধ্যমেই বিস্তার লাভ করছে। আইন শৃংখলা বাহিনী এসব জানলেও কার্যকর তেমন পদক্ষেপ গ্রহণ করছেনা। সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ রতন শেখ জানান পুলিশ অনেক কষ্ট স্বীকার করে ধরে ঠিকই আদালতে সোপর্দ করে কিন্ত ঐদিনই জামিন হয়ে যায়। তাই পুলিশ হতাশ। পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন পুলিশ প্রতিনিয়ত ধরছে মামলা দিচ্ছে। শুধূ পুলিশের পক্ষে একা এসব নির্মূল করা সম্ভব নয়। সামাজিক ভাবে এগিয়ে আসতে হবে। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। পুলিশ কে সহযোগিতা করতে হবে।