বিবিএন নিউজ:
সুনামগঞ্জের ছাতকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই গড়ে ওঠা প্রায় ২০০ শতাধিক কাঠজ্বালিত পাজু বা চুন তৈরির চুল্লিতে প্রতি মাসে পুড়ছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টন কাঠ। এতে একদিকে যেমন দেখা দিয়েছে জ্বালানি কাঠের সংকট, অন্যদিকে বিপন্ন হয়ে পড়েছে বনাঞ্চল ও পরিবেশ। পাজুগুলো থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া, চুনের গুঁড়া ও দুর্গন্ধে বাড়ছে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি। আবাসিক এলাকা, সুরমা নদীর তীর ও ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের আশপাশে এসব পাজু গড়ে উঠলেও কোন কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় দিন দিন বাড়ছে এর সংখ্যা। স্থানীয়দের অভিযোগ পরিবেশ অধিদপ্তর,বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে তা বৃদ্ধি পচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একসময় চুনাপাথর ও চুনশিল্পের জন্য পরিচিত ছিল সুনামগঞ্জের ছাতক। নতুন করে কয়েক মাস ধরে সুরমা নদীর দুই তীর,ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের দুইপাশ,বৌলা তাতিকোনা সহ উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে কাঠজ্বালিত প্রায় ২০০টি পাজু। চুনাপাথর পুড়িয়ে চুন তৈরির এসব কারখানাকে স্থানীয়ভাবে‘পাজু’ বলা হয়।
একসময় খড় বা ছন দিয়ে চুনাপাথর পোড়ানো হলেও পরিবেশগত কারণে এসব কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর ব্যবসাটি স্থানান্তরিত হয় ঢাকার নারায়ণগঞ্জ এলাকায়। সেখানে গ্যাসের মাধ্যমে চুনাপাথর পোড়ানো হলেও সম্প্রতি পরিবেশ ও গ্যাস সংকটের অভিযোগে তা বন্ধ হয়ে যায়। এতে হটাৎ করে চুনের দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়। এই সুযোগে ছাতকের বিভিন্ন এলাকায় রাতারাতি গড়ে উঠতে থাকে অস্থায়ী এসব পাজু।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, প্রতিটি পাজুতে মাসে দুইবার চুনাপাথর পোড়ানো হয়। এতে একটি পাজুতে প্রতি মাসে প্রায় ৭ টন লাকড়ির প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে উপজেলার প্রায় ২০০টি পাজুতে মাসে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টন কাঠ পোড়ানো হচ্ছে।
এতে এলাকায় দেখা দিয়েছে লাকড়ির সংকট। স্থানীয়ভাবে ১২০ টাকা মূল্যের লাকড়ি এখন ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে। লাকড়ির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বনাঞ্চল ধ্বংসের আশঙ্কাও বাড়ছে। পাজুতে পুরানোর জন্য এখন সিলেট বিভাগের বিভিন্ন উপজেলা থেকে জ্বালানী লাকড়ি আনতে হচ্ছে। প্রতিদিন ২০-৩০ টি লাকড়িবাহী ট্রাক ও পিকআপ ছাতকে প্রবেশ করতে দেখা যায়।
পাজুগুলোতে কাঠ দিয়ে চুনাপাথর পোড়ানোর সময় নির্গত হচ্ছে কালো ধোঁয়া। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে চুনের গুঁড়া ও দুর্গন্ধ। এতে পরিবেশের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। একই সঙ্গে এসব পাজুতে কর্মরত শ্রমিক ও মালিকদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় যেকোনো সময় প্রাণহানির মতো দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কাও রয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই গত চয় মাস ধরে জ্বলছে এসব পাজু। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগায়ই অবাধে চলছে পরিবেশবিধ্বংসী এসব কার্যক্রম।
পাজু থেকে প্রতিনিয়ত নির্গত ঘন ধোঁয়া ও ছড়িয়ে পড়া চুনের ধুলার কারণে পরিবেশজনিত রোগবালাইও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের কারণে বন উজাড়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই এসব অবৈধ পাজু বন্ধের দাবী উটেছে উপজেলাজুরে।
ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নুসরাত জাহান বলেন, ছাতকে শিল্প কারখানা থাকায় আগে থেকেই এ উপজেলায় পরিবেশজনিত রোগীর সংখ্যা বেশি। গত কয়েক মাসে এটি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে পাজু ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সালেক মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল আলম পরিবেশের কিছুটা ক্ষতি হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, এটি ছাতকের প্রাচীন ব্যবসা। এতগুলো মানুষ এই ব্যবসা ছাড়া অসহায় হয়ে পড়বে। তাদের দাবী এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে পরিবেশের ছাড়পত্র দিয়ে রাজস্ব আদায় করলে সরকার ও ব্যবসায়ী লাভবান হবে।
ছাতক বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা কেবিএম ফেরদুস বলেন, আমাদের লোকবল সংকট মাত্র ২ জন লোক দিয়ে অভিযান করা কষ্ট কর। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে আলোচনাক্রমে আইনি ব্যস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মোঃ মোহাইমিনুলহক
বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেই। আমরা তাদের নোটিশ দিয়েছি, জরিমানাও করেছি। জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করার জন্য বন বিভাগকে চিঠি দিয়েছি। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের নিয়ে বসে কী করা যায়, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। যেহেতু এগুলা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর তাই আমরা ছাড়পত্র দেইনি, এসব বন্ধের জন্য আমরা কাজ করছি।
ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহি উদ্দিন বলেন, আমরা পরিবেশ অধিদপ্তর ও পাজুর মালিকদের নিয়ে শিগগিরই বসব। অনুমোদন ছাড়া কীভাবে এগুলো চলছে তা জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।