বিবিএন ডেস্ক:
ইতালিতে মানবপাচারের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দেশটিতে যৌন শোষণের তুলনায় শ্রম শোষণের ঘটনা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। একই সঙ্গে গত পাঁচ বছরে মানবপাচারের শিকার বাংলাদেশিদের সংখ্যা প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে। ২০২১ সালে ৫৫ জন বাংলাদেশি ভুক্তভোগী হিসেবে নথিভুক্ত হলেও ২০২৫ সালে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪৪ জনে।
ইতালির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইস্তাতের (Istat) ‘২০২১-২০২৫ মানবপাচার পরিস্থিতি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইতালিতে আনুষ্ঠানিকভাবে মানবপাচারের শিকার হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৯৬৪ জন। তাদের মধ্যে ৯৬৬ জন পুরুষ ও ৯১৫ জন নারী। মানবপাচারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পুরুষ ভুক্তভোগীর সংখ্যা নারীদের ছাড়িয়ে গেছে। ২০২২ সালে মোট ভুক্তভোগীর ৩৩ শতাংশ পুরুষ থাকলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ দশমিক ২ শতাংশে।
শনাক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক, যা মোট ভুক্তভোগীর ২ দশমিক ৭ শতাংশ।
শোষণের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে শ্রম শোষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৮৮ জন। তাদের মধ্যে ৮৮৩ জনই পুরুষ। অন্যদিকে যৌন শোষণের শিকার ৬৯৬ জনের মধ্যে ৫৯৭ জন নারী।
ইস্তাতের তথ্যমতে, দেশব্যাপী মানবপাচারবিরোধী সুরক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ২০২১ সালের তুলনায় ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৫২০ জনে দাঁড়িয়েছে। এ সময় পুরুষ ভুক্তভোগীর সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়ে ৬২৫ থেকে ১ হাজার ৮৪৮ জনে উন্নীত হয়েছে। বিপরীতে নারী ভুক্তভোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৬৯৭ থেকে কমে ১ হাজার ৫৬৪ জন হয়েছে।
বাংলাদেশি ভুক্তভোগীর সংখ্যা প্রায় ১০ গুণ
জাতীয়তাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইতালিতে মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে একসময় নাইজেরিয়ার নাগরিকদের আধিপত্য ছিল। ২০২১ সালে মোট ভুক্তভোগীর ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশ ছিলেন নাইজেরীয়। ২০২৫ সালে এ হার কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ২ শতাংশে।
অন্যদিকে বাংলাদেশি ভুক্তভোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালে মাত্র ৫৫ জন বাংলাদেশি মানবপাচারের শিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিলেন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে ৫৪৪ জনে পৌঁছেছে।
লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নাইজেরীয় ভুক্তভোগীদের ৯১ দশমিক ৪ শতাংশ নারী। বিপরীতে বাংলাদেশি ভুক্তভোগীদের ৯৫ দশমিক ৬ শতাংশই পুরুষ।
কৃষি খাতে শ্রম শোষণ বেশি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনাক্ত শ্রম শোষণের ঘটনাগুলোর ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশই কৃষি খাতে সংঘটিত হয়েছে। নিয়মিত ও বৈধ উপায়ে ইতালিতে প্রবেশ করেও অনেকে মানবপাচার ও শ্রম শোষণের শিকার হচ্ছেন।
২০২৫ সালে সরকারের নির্ধারিত শ্রম ভিসা কোটা ‘ডিক্রেতো ফ্লুসি’ (Decreto flussi) অনুযায়ী ইতালিতে প্রবেশ করেও মানবপাচারের শিকার হয়েছেন ৩৪২ জন।
একই সময়ে মানবপাচারের অভিযোগে ২ হাজার ৪২৮ জনের বিরুদ্ধে বিচারিক কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব অপরাধে জড়িতদের ৬৪ দশমিক ৯ শতাংশ যৌন শোষণ এবং ২৫ দশমিক ১ শতাংশ শ্রম শোষণের উদ্দেশ্যে সক্রিয় ছিল।
সুরক্ষা কার্যক্রমে শীর্ষে সিসিলি
ইতালির সমতা বিষয়ক বিভাগের ডেটাবেজ ‘সিরিত’ (Sirit)-এর তথ্য অনুযায়ী, মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা কার্যক্রমে সিসিলি অঞ্চল সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে।
২০২১ সালে সিসিলিতে সুরক্ষার আওতায় থাকা ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ১৯০ জন। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫০ জনে, যা প্রায় ১৯০ শতাংশ বৃদ্ধি।
এ ছাড়া দেশজুড়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক ভুক্তভোগীদের নথিভুক্তির হারও বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে ছেলে শিশুদের সংখ্যা মেয়ে শিশুদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।