সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে ভয়াবহ অনিয়ম, ব্যাপক দুর্নীতি এবং বর্ধিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ না হওয়ার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজপথ। ‘দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করো, হাওরাঞ্চলে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করো’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে শনিবার (১৪ মার্চ) দুপুরে সুনামগঞ্জ শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার (ট্রাফিক পয়েন্ট সংলগ্ন) প্রাঙ্গণে এক বিশাল প্রতিবাদ ও অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন, সুনামগঞ্জ জেলা কমিটি আয়োজিত এই কর্মসূচিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা কৃষক, পরিবেশকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
সংগঠনের সভাপতি মো. রাজু আহমেদ-এর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মোঃ ওবায়দুল হক মিলন-এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের উপদেষ্টা চিত্ত রঞ্জন তালুকদার, সৈয়দ মহিবুল ইসলাম, ইকবাল কাগজী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জাহাঙ্গীর আলম।
বক্তারা অভিযোগ করেন, গত ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরু হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড ও মাঠ প্রশাসন যথাযথ তদারকি করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইতোমধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে এবং পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে, অথচ প্রশাসনের ‘টনক নড়ছে না’। কোনো কারণে ফসলডুবি ঘটলে এর দায়ভার প্রশাসনকেই নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে মাঠ পর্যায়ের ১১টি চাঞ্চল্যকর পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেন সংগঠনের সহ-সভাপতি শাহ কামাল। পর্যবেক্ষণের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো, বাঁধের সার্ভে ও প্রাক্কলন কর্মসূচী দৃশ্যমান ছিল না এবং গণশুনানি সন্তোষজনক না হওয়ায় প্রকৃত কৃষকরা পিআইসিতে সম্পৃক্ত হতে পারেননি। অক্ষত বাঁধে অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় করা হয়েছে। ১১০টি গুরুত্বপূর্ণ ক্লোজারের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। বাঁধে বালু ও কাদা মিশ্রিত মাটি ব্যবহার করা হয়েছে এবং ‘কম্পেকশন’ না করায় বৃষ্টির ফলে অনেক স্থানে ফাটল ও ধস দেখা দিয়েছে। বাঁধের নামে হাওরের খাস জমি ও উর্বর ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি কেটে লুট করা হচ্ছে।
আন্দোলনের সভাপতি মো. রাজু আহমেদ ১০টি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করেন, যার মধ্যে রয়েছে, পাউবোর প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী ও জেলা প্রশাসকের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং তাদের অবিলম্বে প্রত্যাহার। দুর্নীতি রোধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান। বোরো মৌসুমের সার্ভে ও প্রাক্কলন যথাসময়ে শেষ করে স্থানীয় জনগন ও গণমাধ্যমকে অবহিত করা। ফসলি জমি কর্তন বন্ধ করা এবং অপ্রয়োজনীয় পিআইসিগুলোকে চিহ্নিত করে পুনঃতদন্ত সাপেক্ষে বিল প্রদান করা।
কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য রাখেন সংগঠনের জেলা সহ-সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম মজনু, ওবায়দুল মুন্সী, এড. দীপঙ্কর বনিক, সুহেল আলম; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাইনুদ্দিন, মোঃ আকিক মিয়া; সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল বাছির, ইমরান হোসেন এবং বাঁধ বিষয়ক মহসিন আলম।
এছাড়াও দোয়ারাবাজার, ছাতক, শান্তিগঞ্জ, সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দসহ কৃষক নেতারা বক্তব্য রাখেন। উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের জেলা কমিটির অর্থ সম্পাদক আকিব জাবেদ, বাঁধ বিষয়ক সম্পাদক মিজানুর রহমান, প্রচার সম্পাদক মোশফিকুর রহমানসহ জেলা ও উপজেলা কমিটির সদস্যবৃন্দ।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা স্বেচ্ছায় প্রণোদিত হয়ে জনগণের জানমাল রক্ষায় সব সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে। আজকের এই প্রতিবাদী অবস্থান থেকে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়।