• ২০শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৫ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ১৪ই মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি

ইসরা এবং মিরাজ -মাওঃ আহমদ হাসান চৌধুরী ফুলতলী

bilatbanglanews.com
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৩
ইসরা এবং মিরাজ -মাওঃ আহমদ হাসান চৌধুরী ফুলতলী

নাহমাদুহু ওয়ানুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম। আম্মা বা‘দ

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন
ﺳُﺒْﺤَﺎﻥَ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺃَﺳْﺮَﻯ ﺑِﻌَﺒْﺪِﻩِ ﻟَﻴْﻼً ﻣِّﻦَ ﺍﻟْﻤَﺴْﺠِﺪِ ﺍﻟْﺤَﺮَﺍﻡِ ﺇِﻟَﻰ ﺍﻟْﻤَﺴْﺠِﺪِ ﺍﻷَﻗْﺼَﻰ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺑَﺎﺭَﻛْﻨَﺎ ﺣَﻮْﻟَﻪُ ﻟِﻨُﺮِﻳَﻪُ ﻣِﻦْ ﺁﻳَﺎﺗِﻨَﺎ ﺇِﻧَّﻪُ ﻫُﻮَ ﺍﻟﺴَّﻤِﻴﻊُ ﺍﻟﺒَﺼِﻴﺮُ
পবিত্রতা ও মহিমা সেই মহান সত্তার, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন (মক্কার) মাসজিদুল হারাম থেকে (জেরুজালেমের) মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত– যার আশপাশ আমি বরকতময় করেছি– তাকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখানোর জন্য। নিশ্চয়ই তিনি সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন।

আল্লাহ তাআলা এই আয়াত শুরু করেছেন ﺳُﺒْﺤَﺎﻥَ শব্দ দিয়ে। আমরা যখন আশ্চার্যান্বিত বা বিস্ময়কর কোন ঘটনা শুনি বা দেখি তখন আমরা বলি ﺳﺒﺤﺎﻥ ﺍﻟﻠﻪ । আল্লাহ তাআলা এই শব্দ দ্বারা আয়াত শুরু করে এটাই বুঝাচ্ছেন যে আমি বিস্ময়কর এক ঘটনা বর্ণনা করছি।
ইসরা বলা হয় রাত্রিকালীন ভ্রমণকে। এর ব্যবহার কুরআন কারীমের অন্য জায়গায় এসেছে ﻓَﺄَﺳْﺮِ ﺑِﻌِﺒَﺎﺩِﻱ ﻟَﻴْﻠًﺎ ﺇِﻧَّﻜُﻢْ ﻣُﺘَّﺒَﻌُﻮﻥَ
ইসরা শব্দের অর্থ রাত্রিকালীন ভ্রমণ। এরপরও আয়াতে ﻟَﻴْﻼً (রাত) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে রহস্যের ভিত্তিতে। প্রথম ﻟَﻴْﻼً বা রাত শব্দ নাকেরাহ বা অনির্দিষ্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আর আরবী ভাষায় অনির্দিষ্ট হিসেবে ব্যবহৃত শব্দ একাংশের অর্থও প্রকাশ করে থাকে, অর্থাৎ ﻟَﻴْﻼً বা রাত শব্দটি উল্লেখ করে রাতের আংশিক সময়কে বুঝানো হয়েছে। অতএব মিরাজ সারা রাত্রব্যাপী হয়নি, বরং রাতের সংক্ষিপ্ত সময়ে মি‘রাজের মত এক সুবিশাল ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
আর মসজিদে আকসা থেকে সিদরাতুল মুনতাহা পার হয়ে আল্লাহ যতটুকু চেয়েছেন ততটুকু ঊর্ধ্ব জগতে সফর করাকে মি‘রাজ বলে। মি‘রাজ সম্পর্কে অনেক সহীহ হাদীস বর্ণিত আছে।
মি‘রাজ স্বপ্নযোগে হয়েছিল বলে কেউ কেউ বলেছেন। কিন্তু জমহুর উলামায়ে কিরামের মত হলো মি‘রাজ স্বশরীরে হয়েছে। এবং এটাই বিশুদ্ধ মত। এর স্বপক্ষে অনেক সাহাবীর বর্ণনা আছে। যারা মি‘রাজকে স্বপ্নযোগে বলতে চান তারা দু’জন সাহাবীর হাদীসকে প্রমাণ হিসাবে পেশ করেন। একজন আম্মাজান হযরত আয়শা (রা.), অন্যজন হযরত মুআবিয়া (রা.)। মুহাদ্দিসীনে কিরাম এ দুই সাহাবীর বর্ণিত হাদীসের বিভিন্ন জবাব দিয়েছেন। তাদের অনেকে জবাবে বলেছেন, এ দু‘জন সাহাবীর হাদীস দিয়ে মি‘রাজ স্বপ্নযোগে প্রমাণ হয় না। কেননা, যখন মি‘রাজ সংঘটিত হয়েছে তখন আম্মাজান আয়শা সিদ্দীকা (রা.) অল্প বয়স্কা ছিলেন। তখনও রাসূল (সা.)-এর সাথে তার শাদী মুবারক হয় নি। আর মুআবিয়া (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেছেন মক্কা বিজয়ের এক বছর পূর্বে। মি‘রাজের সময় তিনি মুসলমান ছিলেন না। তাই বহুসংখ্যক জলীলুল কদর সাহাবীর বর্ণিত হাদীসের মুকাবিলায় তাদের হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়।
জমহুর মুফাচ্ছিরীনে কেরাম এর মত হলো মি‘রাজ স্বশরীরে হয়েছে। কেননা আল্লাহ তাআলা আয়াত শুরু করেছেন ﺳُﺒْﺤَﺎﻥَ দিয়ে। যা দ্বারা বিস্ময়কর ঘটনা বুঝায়। স্বপ্নযোগে মি‘রাজ অসম্ভব কিছু না। এটা বিস্ময়করও হতো না। তাছাড়া পরবর্তী শব্দ ﺑِﻌَﺒْﺪِﻩِ দ্বারা রূহ এবং দেহের সমন্বয়কে বুঝায়। এটা থেকেও বুঝা যায় রাসূল (সা.) স্বশরীরে মি‘রাজে গিয়েছিলেন।
প্রসঙ্গত আল্লাহ তাআলা তার হাবীব (সা.) কে ﻋﺒﺪ বলেছেন। ﻋﺒﺪ অর্থ বান্দাহ। এটা আমাদের নবীর জন্য অত্যন্ত সম্মানের যে আল্লাহ তাআলা তাঁকে বান্দাহ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। মালিক যখন তার দাসকে দাস বলে স্বীকার করে তখন দাসের জন্য সেটা পরম সৌভাগ্য। আল্লাহ তাআলা তার হাবীবকে নিজের বান্দাহ হিসাবে সম্বোধন করেছেন। রাসূল (সা.)ও অত্যন্ত বিনয়ী হয়ে নিজেকে আল্লাহর বান্দাহ হিসাবে পরিচয় দিতেন। রাতের বেলা নামায পড়তে পড়তে তার পা মুবারক ফুলে যেত। আম্মাজান জিজ্ঞেস করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার এতো কষ্ঠ করার কী প্রয়োজন? নবীজি জবাবে বলেছিলেন, আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দাহ হব না?

অনেকে যুক্তি বা বিজ্ঞান দিয়ে মি‘রাজ প্রমাণ করতে চান। এটা ঠিক নয়। কারণ মু‘জিযাকে যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করার অবকাশ নেই। মু‘জিযা অর্থই তো অক্ষম করে দেওয়া। যুক্তিতে ধরুক বা না ধরুক মু‘জিযা বিশ্বস করতে হবে। তবে এটা ঠিক যে, বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার কারণে বিস্ময়কর ঘটনাগুলোর বিশ্বাস করতে মানুষের জন্য সুবিধা হয়েছে। যেমন রকেট, বিমান, ফোন ইত্যাদি সময়, দূরত্ব, গতির ব্যাপারে মানুষের পূর্বের ধারণা থেকে সহজেই বেরিয়ে আসতে পারছে।

মি‘রাজে রাতের সংক্ষিপ্ত ঘটনা হলো- রাসূল (সা.) উম্মে হানীর ঘরে ছিলেন, কোন বর্ণনা মতে শি‘আবে আবী তালিবে ছিলেন, কোন বর্ণনা মতে হাতীমে ছিলেন, আবার কোন বর্ননা মতে মসজিদে হারামে ছিলেন। বর্ণনাগুলোর সামঞ্জস্য এভাবে করা যায় যে, রাসূল (সা.) উম্মে হানীর ঘরে ছিলেন, ঘরটি ছিল শি‘আবে আবী তালিবে অবস্থিত, যা হাতীমের নিকটবর্তী। সেখান থেকে রাসূল (সা.) কে শক্কে সদর করার জন্যে মসজিদে হারামে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখান থেকে বোরাকে আরোহন করানো হয়। বোরাক সম্পর্কে হাদীসে সংক্ষিপ্ত বিবরণে বলা হয়েছে এটি খচ্চর থেকে ছোট আর গাধা থেকে বড়। এটি একটি জান্নাতী প্রাণী। বলা হয়েছে তার দু’পায়ের দুরত্ব দৃষ্টি সীমা পর্যন্ত। অনেকে বোরাকের কাল্পনিক ছবি একেছে। এটা সম্পূর্ণ ভূয়া। আবার আমাদের মধ্যে অনেকে বরকত মনে করে এই কাল্পনিক বোরাকের ছবি ঘরের দেয়ালে রাখেন। অথচ হাদীস হলো-
ﻻ ﺗﺪﺧﻞ ﺍﻟﻤﻼﺋﻜﺔ ﺑﻴﺘﺎً ﻓﻴﻪ ﺗﺼﺎﻭﻳﺮ
-“এমন ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করেন না যে ঘরে কোন প্রাণীর ছবি থাকে”।

রাসূল (সা.) যখন বোরাকের উপর আরোহণ করতে ইচ্ছা করলেন তখন সে নড়াচড়া করতে লাগলো। হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম তাকে সম্বোধন করে বললেন, তোমার কি হলো? আল্লাহ তাআলার কাছে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে অধিক সম্মানী কোনো ব্যক্তি তোমার উপর আরোহণ করেনি। এই কথাটি শ্রবণ করা মাত্র সে অত্যন্ত লজ্জিত হলো, নিরব হয়ে গেল।
হাদীস শরীফে এসেছে শাদ্দাদ বিন দাউস কর্তৃক বর্ণিত রসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, মিরাজ রজনীতে আমি এমন এক প্রান্তর অতিক্রম করলাম যেখানে অসংখ্য খর্জুর বৃক্ষরাজি দৃষ্টিগোচর হল। জিবরাঈল (আ.) বললেন, এখানে অবতরণ করে দু’রাকআত নামায আদায় করুন। আমি অবতরণ করে নামায পড়লাম। জিবরাঈল (আ.) বললেন, আপমি কি জানেন কোন স্থানে নামায পড়লেন? আমি বললাম, না, তা আমার জানা নেই। জিবরাঈল (আ.) বললেন, আপনি ইয়াসরিব অর্থাৎ পবিত্র মদীনায় নামায পড়লেন, যেখানে আপনি হিজরত করবেন। অত:পর পুনরায় যাত্রা শুরু হল। অপর এক স্থানে এসে জিবরাঈল (আ.) আবার অবতরণপূর্বক নামায আদায় করতে বললেন। আমি নেমে নামায আদায় করলাম। জিবরাঈল বললেন, এ জায়গার নাম সীনা উপত্যকা। এখানে ছিল একটি বৃক্ষ। এর নিকটে মূসা (আ.) আল্লাহর সাথে কথা বলেছিলেন। আপনি সেই বৃক্ষের কাছেই নামায পড়লেন। আবার আরেকটি প্রান্তর অতিক্রম কালে জিবরাঈল (আ.) তথায় নামায পড়তে বললে আমি নেমে নামায পড়লাম। জিবরাঈল (আ.) বললেন, আপনি মাদায়েনে নামায পড়লেন। (এখানে শোয়ায়েব (আ.)-এর বাসস্থান ছিল)। আবার যাত্রা শুরু হল। আরেক স্থানে পৌঁছে জিবরাঈল পুনরায় নামায পড়তে বললেন। আমি নামায পড়লাম। জিবরাঈল (আ.) বললেন, এটা বাইতুল লাহাম, যেখানে ঈসা (আ.) জন্মগ্রহণ করেন। ইবনে আবূ হাতেম, বায়হাকী, বাযযার এবং তাবরানী শাদ্দাদ বিন আউস থেকে এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
এই ঘটনা থেকে আমরা দলীল পাই যে নেককারগণ যে স্থানে জন্মগ্রহণ করেন, ইন্তিকাল করেন, বসবাস করেন সেটা বরকতপূর্ণ। কুরআন শরীফেও এর দলীল আছে। ইসরার আয়াতের শেষাংশ হলো ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺑَﺎﺭَﻛْﻨَﺎ ﺣَﻮْﻟَﻪُ মুফাচ্ছিরগণ বলেছেন বায়তুল মুকাদ্দাসের চারপাশ বরকতময় হওয়ার একটি কারণ হলো এখানে আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং নেককার ব্যক্তিদের আবাসস্থল ছিল।
হুযুর (সা.) বোরাকে আরোহী হয়ে চলছেন। পথিমধ্যে এক বৃদ্ধ তাঁকে ডাকলো। জিবরাঈল (আ.) বললেন, আপনি সামনে চলুন। এদিকে লক্ষ্য করার প্রয়োজন নেই। কিছুটা অগ্রসর হবার পর এক বৃদ্ধ তাঁকে ডাক দিলে জিবরাঈল (আ.) বললেন, সামনে চলুন। আরো কিছুটা পথ যাওয়ার পর একটি জামাত হুযূর (সা.)-কে সালাম জানালেন—
ﺍﻟﺴﻼﻡ ﻋﻠﻴﻚ ﻳﺎ ﺍﻭﻝ، ﺍﻟﺴﻼﻡ ﻋﻠﻴﻚ ﻳﺎ ﺍﺧﺮ، ﺍﻟﺴﻼﻡ ﻋﻠﻴﻚ ﻳﺎ ﺣﺎﺷﺮ .
জিবরাঈল (আ.) নবীজিকে তাদের সালামের উত্তর দিতে বললেন। অত:পর জানালেন, আপনাকে আহ্বানকারী প্রথম বৃদ্ধা হলো দুনিয়া। আর দ্বিতীয় বৃদ্ধটি হলো শয়তান। উভয়ের উদ্দেশ্য দুনিয়ার দিকে আকর্ষণ করানো। আপনি যদি তাদের ডাকে সাড়া দিতেন তাহলে আপনার উম্মত আখেরাতের উপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দিত। আর যারা আপনাকে সালাম জানিয়েছে তারা হলেন ইবরাহীম (আ.), মূসা (আ.) এবং ঈসা (আ.)। ইবনে জারীর এবং বাইহাকী এই হাদীসখানা আনাস (রা.)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

মুসলিম শরীফে আনাস (রা.) কর্তৃক বর্ণিত রসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, মিরাজের রজনীতে মূসা (আ.)-এর নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাকে কবরের উপর দাঁড়িয়ে নামায পড়তে দেখেছি।
ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, মিরাজ রজনীতে আমি মূসা (আ.), দাজ্জাল এবং জাহান্নামের দ্বাররক্ষী মালিককে দেখেছি।
বায়হাকী শরীফে বর্ণিত আছে রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন আমি এবং জিবরাইল (আ.) বায়তুল মুকাদ্দাস প্রবেশ করি। আমরা দুই রাকাআত নামায আদায় করি। সেখানে অনেক লোকের সমাগম হলো। একজন মুআযযিন আযান দিলেন, একামতও দেওয়া হলো। আমরা সকলে কাতারবন্দী হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম কে ইমাম হবেন। এমন সময় জিবরাইল (আ.) আমার হাত ধরে আমাকে সামনে এগিয়ে দিলেন, আমি সকলের ইমামতী করলাম। নামায শেষে জিবরাইল (আ.) আমাকে বললেন আপনি কি জানেন আপনার পিছনে কারা নামায আদায় করেছেন? আমি বললাম না। তিনি বললেন পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল প্রেরিত হয়েছেন সকলেই আপনার পিছনে নামায আদায় করেছেন।
নামায শেষে প্রিয়নবী (সা.) যখন বাইরে তাশরীফ আনলেন তখন জিবরাইল তাঁর সম্মুখে দু’টি পাত্র রাখলেন। একটিতে ছিল দুধ আরেকটিতে ছিল শরাব। প্রিয়নবী (সা.) দুধ বেছে নিলেন। জিবরাইল (আ.) বললেন আপনি স্বভাব ধর্মকে পছন্দ করেছেন।

বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে রাসূল (সা.) জিবরীল আমীন কে নিয়ে আকাশের দিকে রওয়ানা দিলেন। এই সফরকে বলা হয় মি’রাজ। প্রথম আসমানে যাওয়ার পর দ্বাররক্ষী জিজ্ঞেস করলেন কে? জিবরীল (আ.) উত্তর দিলেন আমি জিবরীল। আবার জিজ্ঞেস করা হলো আপনার সাথে কে? জিবরাইল (আ.) বললেন মুহাম্মদ (সা.)। জানতে চাওয়া হলো তাঁকে আনার জন্যেই কি আপনি আদিষ্ঠ হয়েছেন? জিবরীল (আ.) বললেন হ্যা! আমাকে তাঁর কাছেই পাঠানো হয়েছে। দ্বার খুলে দেওয়া হলো। প্রথম আসমানে প্রবেশ করে রাসূল (সা.) হযরত আদম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাত করলেন। আদম (আ.) তাকে স্বাগত জানালেন ﻣَﺮﺣَﺒﺎً ﺑﺎﻻﺑﻦِ ﺍﻟﺼﺎﻟﺢ ﻭﺍﻟﻨﺒﻲِّ ﺍﻟﺼﺎﻟﺢ হে সুসন্তান, হে সৎ নবী! আপনাকে স্বাগতম। অনুরূপভাবে রাসূল (সা.) দ্বিতীয় আসমানে হযরত ঈসা (আ.) এবং হযরত ইয়াহইয়া (আ.)-এর সাথে সাক্ষাত করেন। তৃতীয় আসমানে হযরত ইউসূফ (আ.)-এর সাথে সাক্ষাত করেন। চতুর্থ আসমানে হযরত ইদরীস (আ.), পঞ্চম আসমানে হযরত হারূন (আ.), ষষ্ট আসমানে হযরত মূসা (আ.) এবং সপ্তম আসমানে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাত করেন।
ইবরাহীম (আ.) প্রিয়নবী (সা.) কে বলেন আপনি আপনার উম্মতকে আমার সালাম দিবেন, আর বলবেন জান্নাতের পানি এবং ফল খুবই মিষ্টি, এর মাঠ ফাকা। তারা যেন এই ফাকা মাঠে বেশি করে গাছ লাগায়। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, এই ফাকা মাঠের চারা কি? হযরত ইবরাহীম আ. বললেন, চারা হলো এই তাসবীহ।
ﺳﺒﺤﺎﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﺍﻟﺤﻤﺪ ﻟﻠﻪ ﻭﻻ ﺍﻟﻪ ﺍﻻ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﺍﻟﻠﻪ ﺍﻛﺒﺮ
সালাতুত তাসবীহ আদায়ের মাধ্যমে এই দু‘আ বেশী বেশী পাঠের সুযোগ হয়। কোন বর্ণনায় আছে, চারা হলো—
لا حول ولا قوة إلا بالله العلي العظيم
আমাদের পিতার শিখানো এই আমল আমাদের করা উচিত।

রাসূল (সা.) কে জাহান্নামের শাস্তি দেখানো হলো। রাসূল (সা.) এমন কতক লোক দেখলেন যাদের নাসিকা তামার তৈরি, তারা নিজেদের নখ দ্বারা স্বীয় বক্ষ ও অবয়ব টেনে ছেড়ে ক্ষত বিক্ষত করছে। তিনি এর মর্মহেতু জানতে চাইলে জিবরাঈল (আ.) বললেন, এরা মানুষের গোশত ভক্ষণ করত অর্থাৎ গীবত এবং অপরের দোষ-ত্রুটির অনুসন্ধান করত। ইমাম আহমদ এবং ইমাম আবূ দাঊদ হাদীসখানা আনাস (রা.)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন।

আরেক সম্প্রদায়ের লোকদের অতিক্রম কালে দেখা গেল পাথরের আঘাতে তাদের মাথা চূর্ণ করা হচ্ছে। অত:পর তাদের মাথা আগের মত হয়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্য নিরন্তর চালু ছিল। নবী করীম (সা.) জিজ্ঞেস কররেন, এরা কারা? জিবরাঈল (আ.) বললেন, ফরয নামাযের ক্ষেত্রে এরা গড়িমসি করত।
অত:পর আরো কিছু লোক দেখা গেল, তাদের সম্মুখে এক পাত্রে রান্না করা গোশত এবং অপর পাত্রে কাঁচা ও পচা গোশত রক্ষিত ছিল। তারা রান্নাকৃত গোশতের পরিবর্তে কাঁচা ও পচা গোশত ভক্ষণ করছিল। হুযূর (সা.) জানতে চাইলেন এরা কারা? জিবরাঈল (আ.) বললেন, এরা আপনার উম্মতের ঐ সকল পুরুষ যারা ঘরে বৈধ ও সতী-সাধ্বী স্ত্রী রেখে অপর নারীর সাথে রাত্রি যাপন করত। আর এদের মধ্যে যারা মহিলা তারা আপনার উম্মতের ঐ সকল রমনী যারা তাদের পবিত্র স্বামীকে ছেড়ে অন্য পুরুষের সাথে রাত কাটাত।

রাসূল (সা.) দেখলেন, কিছু লোকের জিহ্বা ও ঠোঁট কাঁচি দ্বারা কেটে দওয়া হচ্ছিল। কাটা শেষ হলে আবার তা আগের মত হয়ে যায়। পুনরায় কাটা হয়। এভাবে এ কাজ অব্যাহত ছিল। হুযূর (সা.) তাদের পরিচয় জানতে চাইলেন। জিবরাঈল (আ.) বললেন, ওরা ঐ সব বক্তা যারা অপরকে আমল করতে বলত অথচ নিজেরা আমল করত না। (খাসায়েসুল কুবরা)

এরপর রাসূল (সা.) সিদরাতুল মুনতাহায় গেলেন। জিবরাইল (আ.) সিদরাতুল মুনতাহায় থেমে গেলেন। সেখান থেকে রাসূল (সা.) আরশে আযীম সহ উর্ধ্ব জগতে আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী সফর করেন। যখন তিনি বুঝতে পারলেন তিনি আল্লাহর জালালিয়তের সামনে উপস্থিত তখন পড়লেন ﺍﻟﺘَّﺤِﻴَّﺎﺕُ ﻟِﻠَّﻪِ ﻭَﺍﻟﺼَّﻠَﻮَﺍﺕُ ﻭَﺍﻟﻄَّﻴِّﺒَﺎﺕُ আল্লাহ তাআলা তার নবীকে সালাম দিলেন ﺍﻟﺴَّﻼﻡُ ﻋَﻠَﻴْﻚَ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲُّ ﻭَﺭَﺣْﻤَﺔُ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻭَﺑَﺮَﻛَﺎﺗُﻪُ আমাদের জন্যে সে সালামকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন। আমরা যদি নামাযে প্রিয়নবী (সা.) কে সালাম না দেই তাহলে আমাদের নামায সহীহ হবে না।
আল্লাহ পাকের সালাম রাসূল (সা.) শুধুমাত্র নিজের জন্য নিতে পারতেন কিন্তু মহান আল্লাহর সালামের সৌভাগ্যে তার নেককার উম্মতকে শামিল করলেন। তাই তিনি বললেন ، ﺍﻟﺴَّﻼﻡُ ﻋَﻠَﻴْﻨَﺎ ﻭَﻋَﻠَﻰ ﻋِﺒَﺎﺩِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺍﻟﺼَّﺎﻟِﺤِﻴﻦَ আকাশবাসী বললেন
ﺃَﺷْﻬَﺪُ ﺃَﻥْ ﻻ ﺇِﻟَﻪَ ﺇِﻻ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻭَﺃَﺷْﻬَﺪُ ﺃَﻥَّ ﻣُﺤَﻤَّﺪًﺍ ﻋَﺒْﺪُﻩُ ﻭَﺭَﺳُﻮﻟُﻪُ

মি‘রাজ রজনীতে রাসূল (সা.) আল্লাহ তাআলাকে দেখেছেন কি না এ সম্পর্কে ইখতেলাফ আছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা হলো রাসূল (সা.) আল্লাহ তাআলা কে দেখেছেন। সূরা নাজমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন ﺛُﻢَّ ﺩَﻧَﺎ ﻓَﺘَﺪَﻟَّﻰ ﻓَﻜَﺎﻥَ ﻗَﺎﺏَ ﻗَﻮْﺳَﻴْﻦِ ﺃَﻭْ ﺃَﺩْﻧَﻰ
এই আয়াতের তাফসীরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন-
ﻗﺪ ﺭﺁﻩ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲّ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলাকে দেখেছেন। (শিফা)

তিনি আরো বলেন
ﺃﺗﻌﺠﺒﻮﻥ ﺃﻥ ﺗﻜﻮﻥ ﺍﻟﺨﻠﺔ ﻹﺑﺮﺍﻫﻴﻢ، ﻭﺍﻟﻜﻼﻡ ﻟﻤﻮﺳﻰ، ﻭﺍﻟﺮﺅﻳﺔ ﻟﻤﺤﻤﺪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ
(মহান আল্লাহর সাথে) ইবরাহীম (আ.)-এর বন্ধুত্ব, মূসা (আ.)-এর কথা বলা এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের দীদার হওয়াতে তোমরা কি আশ্চর্যবোধ করো?

মি‘রাজ রাতে আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মদীর জন্যে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করে দিলেন। প্রথমে ৫০ ওয়াক্ত ছিল। তারপরে হযরত মূসা (আ.) এর অনুরোধে রাসূল (সা.) ৫০ ওয়াক্ত নামায কমানোর আবেদন করেন। এভাবে বার বার আল্লাহর দরবারে আবেদনের পর অবশেষে ৫ ওয়াক্ত নির্দিষ্ট হয়। আল্লাহ তাআলা ঘোষনা দিলেন যারা এই ৫ ওয়াক্ত নামায আদায় করবে তাদেরকে ৫০ ওয়াক্ত নামাযের সাওয়াব দেওয়া হবে।

সকল নবীর মি‘রাজ হযেছে যমীনে, আর আমাদের নবীর মি‘রাজ হয়েছে সাত আসমানেরও উপরে। এর কারণ হিসাবে কোন কোন কিতাবে বলা হয় আকাশবাসী মহান আল্লাহর কাছে তার প্রিয় হাবীব (সা.)-এর ফায়েয ও বারকাত লাভের আবেদন করে। আল্লাহ তাআলা তাদের আকাঙখা পূরণের জন্যে রাসূল (সা.) কে মি‘রাজে নেন।
তাছাড়া আরেকটি কারণ হতে পারে আমরা জান্নাত-জাহান্নাম, আখেরাত ইত্যাদির সাক্ষ্য দেই প্রিয় নবী (সা.)-এর কথার ভিত্তিতে। তিনি বলেছেন এ গুলো সত্য তাই আমরা সত্য বলে বিশ্বাস করি। কেউ যদি প্রশ্ন করে নবী (সা.) কি এগুলো স্বচক্ষে দেখেছেন? কেউ যেন এই প্রশ্নের সুযোগ না পায় সে জন্যে আল্লাহ তাআলা তার হাবীবকে স্বশরীরে মি’রাজে নিয়ে দেখিয়ে এনেছেন। আর প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সত্যবাদীতার ব্যাপারে কাফেররাও কোন প্রকার সন্দেহের মধ্যে ছিল না ছিল। নবূওয়ত পূর্ব যুগেই তারা তাকে আল-আমীন উপাধিতে ভূষিত করেছে।

মি‘রাজ থেকে ফিরে এসে রাসূল (সা.) যখন মি‘রাজের কথা বর্ণনা করলেন তখন কাফেররা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করলো। কেননা তারা জানত মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস যেতে হলে প্রায় একমাস সময় লাগে। সেখানে তিনি রাতের সামান্য সময়ে সময়ে গিয়ে আবার ফিরে আসলেন। এটা অসম্ভব। তারা আবূ বকর (রা.) কে রাস্তায় পেয়ে বলল শুনেছো? তোমার নবী এরকম বলেছেন। আবূ বকর (রা.) এটা শুনে বললেন আল্লাহর কসম! যদি তিনি এ কথা বলে থাকেন তাহলে আমি অবশ্যই বিশ্বাস করব। এদিন থেকে আবূ বকর (রা.) সিদ্দীক উপাধি লাভ করলেন।

কাফেরা রাসূল (সা.)-এর মিরাজের দাবীকে যাচাই করার জন্য জন্য রাসূল (সা.) কে এসে প্রশ্ন করলো আপনি তো বায়তুল মুকাদ্দাস গেছেন, তাহলে বায়তুল মুকাদ্দাসের বিবরণ আমাদেরকে দিন। রাসূল (সা.) বলেন আমি এই দিন সবচেয়ে বেশি পেরেশান হয়েছি। তারপর বলেন-
ﻓﺠﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻟﻲ ﺑﻴﺖ ﺍﻟﻤﻘﺪﺱ ﻓﻄﻔﻘﺖ ﺃﺧﺒﺮﻫﻢ ﻋﻦ ﺁﻳﺎﺗﻪ ﻭﺃﻧﺎ ﺃﻧﻈﺮ ﺇﻟﻴﻪ
-আল্লাহ তাআলা আমার জন্য বায়তুল মুকাদ্দাসকে তুলে ধরালেন। আমি বায়তুল মুকাদ্দাস দেখে দেখে তার বিবরণ দিয়েছি।
তারপর তারা আরো প্রমাণ চাইলো। রাসূল (সা.) বললেন তোমাদের এক কাফেলা বানিজ্যে গেছে। আমি তাদেরকে রাস্তায় দেখেছি, তারা তাদের উট হারিয়ে ফেলেছে। পরবর্তীতে তা খুঁজে পেয়েছে। তারা তিন দিন পর মক্কায় আসবে।

সংক্ষিপ্ত সময়ে মি‘রাজের পূর্ণ বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। এখানে বিক্ষিপ্তভাবে এ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কিছু আলোকপাত করা হলো। এ বিষয়ে যারা বিস্তারিত জানতে চান তারা ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী (র.)-এর খাসায়িসুল কুবরা, আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.)-এর মুনতাখাবুস সিয়ার দেখতে পারেন।

লেখকঃ খতিব সুপ্রিম কোর্ট মাজার জামে মসজিদ, ঢাকা।