• ১৯শে জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৫ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ১৩ই জিলহজ, ১৪৪৫ হিজরি

সিলেটে দলীয় মেয়র প্রার্থী হতে ৬ নেতার চোখ নগরের মসনদে

bilatbanglanews.com
প্রকাশিত ডিসেম্বর ১০, ২০২১
সিলেটে দলীয় মেয়র প্রার্থী হতে ৬ নেতার চোখ নগরের মসনদে

 

বিশেষ প্রতিনিধি, সিলেট থেকে: গত নির্বাচনে কামরান কেঁদে কেঁদে বলেছিলেন- এটাই আমার শেষ নির্বাচন। তার কথাই সত্য হলো। জীবনের শেষ নির্বাচন খেলে গত বছরের ১৫ই জুন মহামারি করোনার কাছে হেরে চিরতরে বিদায় নিয়েছেন তিনি। কামরানহীন সিলেটে এবার নগর ভবনের মসনদে আওয়ামী লীগের হাফ ডজন প্রার্থী প্রস্তুতি চালাচ্ছেন।

সিলেট নগরের মসনদ নিয়ে আওয়ামী লীগের দুঃখ অনেক। দল ক্ষমতায় থাকলেও পরপর দু’বার হাতছাড়া হয় ওই মসনদ। ভোটের মানুষ কামরান সঙ্গে থাকলেও দলের ভেতরের অনৈক্যের কারণে সিলেট সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মসনদ হারায়। এবার বেঁচে নেই কামরান।

আগামী ২০২৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে শেষবার সিলেট সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। প্রায় দেড় বছর সময় থাকলেও আওয়ামী লীগ চাইছে; এবার সিটির মসনদ দখলে রাখতে। ইতিমধ্যে নানা ঘটনায় আলোচিত, সমালোচিত হয়েছেন বর্তমান বিএনপিদলীয় মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। আগের মতো আর সহজে বৈতরণী পাড়ি দেয়ার সুযোগ এবার তার কম। বিএনপিতেও আছে দলাদলি। এ কারণে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে যোগ্য প্রার্থী দিয়েই এবার ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াইয়ে নামার আভাস মিলেছে। আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কামরান না থাকলেও তার পরিবার আছে আলোচনায়।

ইতিমধ্যে কামরানপুত্র মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আরমান আহমদ শিপলু আলোচনায় উঠে এসেছেন। শিপলু পিতার মতো অদম্য। একা একা হেঁটে নিজের অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এক্ষেত্রে তিনি পিতার রেখে যাওয়া কর্মের সুফলও পাচ্ছেন। যেখানে যাচ্ছেন সেখানেই তাকে সাদরে বরণ করা হচ্ছে। শিপলুকে নিয়ে আওয়ামী লীগে নাটকীয়তা কম হয়নি। ২০১৯ সালে আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে শিপলুকে জেলার সম্পাদকীয় পদে রাখা হয়েছিলো। পূর্বের ধারাবাহিকতায় শিপলুকে জেলার রাজনীতির সঙ্গে রাখা হলেও পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় নির্দেশে তাকে মহানগরে নিয়ে আসা হয়। তাকে সাংগঠনিক সম্পাদকও করা হয়েছে।

মেয়র পদে মূল আলোচনায় রয়েছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আসাদউদ্দিন আহমদ ও যুগ্ম সম্পাদক আজাদুর রহমান আজাদ। দু’জনের দিকে ফোকাস সবার। সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আসাদ। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আসাদ দলীয় ফোরামে প্রয়াত কামরানের সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। পরবর্তীতে দলের সভানেত্রীর উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের এক সভায় তিনি নির্বাচনে কামরানকে ছাড় দেন। এতে প্রশংসিত হন আসাদ। এ কারণে কামরানের মৃত্যুর পর আসাদ আলোচনায় থাকলেও ভোটের মাঠে নতুন মুখ তিনি। সিলেট নগরের বর্তমান মেয়রের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে এরই মধ্যে সরব হয়েছেন আসাদ। বর্তমান মেয়র যখন আওয়ামী লীগ নিয়ে কটাক্ষ করেছিলেন তখন জবাব দিয়ে আলোচিত হন। প্রশংসিত হন দলীয় বলয়ে। আর এসব কিছুই আসাদ করছেন দলীয় মেয়র প্রার্থী হতে। নিজেকে রাখছেন বিতর্কমুক্ত। এখন তিনি সাবধানে পা ফেলছেন। সাধারণ সম্পাদক পদ হারানোর পর নিজেকে সংযত করে রেখেছেন। আসাদ উদ্দিন আহমদের বড় ভাই মাসুক উদ্দিন আহমদ এখন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি। মাসুক উদ্দিন আহমদ মেয়র নির্বাচন নিয়ে কোনো কথাই বলছেন না।

বরং দলের প্রয়োজনে তিনি জেলার শীর্ষ নেতা হওয়ার পরও মহানগরের দায়িত্ব পালন করছেন। সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আজাদুর রহমান আজাদ নগরের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের তিন বারের কাউন্সিলর। গত নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই নির্বাচিত হন। দল এবং দলের বাইরে রয়েছে তার গ্রহণযোগ্যতা। এক সময়ের ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতা আজাদের পরিবার নগরের পূর্বাঞ্চলে অনেক আগে থেকেই শাসন করছেন। জনপ্রতিনিধি পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে আজাদ কাউন্সিলর হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন। নিজের এলাকাকে উন্নত করেছেন। এখন আজাদের চোখ নগরের মসনদে। গতবারও তিনি ছিলেন মেয়র পদের আলোচনায়। বর্তমান মেয়রের সমালোচনায় তিনি মুখর। যেখানেই গলদ হচ্ছে, গলা উঁচিয়ে প্রতিবাদ করছেন। এতে করে নজরবাসীর নজর কেড়েছেন তিনি। এ ছাড়া সিলেট-১ আসনের এমপি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেনের সুনজরে রয়েছেন তিনি। প্রায় মাসখানেক আগে সিলেটের এক সভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তরফ থেকে এমন ইঙ্গিত মিলেছে। আজাদের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে সিলেট নগরে বর্তমানে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। নিজেকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখতে এবার আজাদের অনুসারী ছাত্রলীগের টিলাগড় বলয়ের নেতারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। মেয়রের মসনদে চোখ থাকায় অনেক কিছুই এড়িয়ে যাচ্ছেন আজাদ। নিজেকে ব্যস্ত রাখছেন খেলাধুলা সহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে।

গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সিলেটের মেয়র পদে আলোচনায় ছিলেন আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। এই দুই নেতার মধ্যে এখন চলছে ঠাণ্ডা লড়াই। কারণ সিলেটে মিসবাহ সিরাজের দলীয় মসনদ দখলে নিয়েছেন নাদেল। সিলেটে নাদেল তার নিজের মতো করে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। প্রভাবও রয়েছে তার। সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল এক সময় চেয়েছিলেন সিলেট নগরের মসনদটি। এখনো তার চোখ ওদিকেই আছে। তবে নিজ এলাকা মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় সাম্প্রতিক সময়ে তার দৌড়ঝাঁপ বেড়েছে। দলীয় নেতারা জানিয়েছেন; মৌলভীবাজার-২ আসনের দিকেও নজর রয়েছে নাদেলের। ওই আসনে এমপি হলে তার স্বপ্ন পূর্ণ হবে। তবে নগর ভবনের মসনদও হাতছাড়া করতে চাইছেন না তিনি। সিলেট নগরে বর্তমান সময়ে ভোটের মাঠে নাদেল বড় ফ্যাক্টর। গ্রহণযোগ্যতার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যেও রয়েছে তার ভোট ব্যাংক।

সিলেট আওয়ামী লীগে এই মুহূর্তের সবচেয়ে অবহেলিত নেতা এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। তিনবার ছিলেন দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। চোখ ছিল সিলেট-৩ আসনের দিকে। এক সময় মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন। এ কারণে নগর ভবনের মসনদের দিকে তিনি তাকিয়ে আছেন ২০০৮ সাল থেকেই। কামরানের কারণে তার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। এবার তিনি দলীয় ফোরামে মেয়র পদে প্রার্থিতা চাইবেন বলে তার ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন। নৌকার প্রার্থী হলে মিসবাহও চমক দেখাতে পারবেন বলে জানিয়েছেন তারা।

দলীয় মেয়র প্রার্থী হতে এবারই প্রথম আলোচনায় এসেছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন। দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের অনুগত নেতা হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক জাকির সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগে বিতর্কহীন ভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। নিজেকেও রাখছেন সমালোচনার ঊর্ধ্বে। বিশেষ করে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে তার চেষ্টার কমতি নেই। সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের তৃণমূলে জাকিরের রয়েছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা।