• ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ২০শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ , ২৩শে শাবান, ১৪৪৫ হিজরি

ছাতকে টানা পাঁচবারের নির্বাচিত চন্দ্রবান বিবির মানবেতর জীবন

bilatbanglanews.com
প্রকাশিত নভেম্বর ১৭, ২০২১
ছাতকে টানা পাঁচবারের নির্বাচিত চন্দ্রবান বিবির মানবেতর জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক:সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ছৈলা-আফজলাবাদ ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য চন্দ্রবান বিবি এবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

এ নিয়ে তিনি টানা পাঁচবার নির্বাচিত সংরক্ষিত নারী সদস্য। প্রায় দুই যোগ ধরে ১, ২ ও ৩নং ওয়ার্ডের জনপ্রতিনিধিত্ব করে আসছেন ৬৩ বছর বয়সী সংগ্রামী নারী। কিন্তু নেই তার বসতভিটে। থাকছেন অন্যের গৃহে।

বয়সের ভারে হাটতে-চলতে পারেন না তিনি আগের মতো। রোগাক্রান্ত শরির নিয়ে প্রতিনিধিত্ব করে যাচ্ছেন। যে কোন বিপদে-আপদে ভ্যানেটি ব্যাগ কাঁেদ ফেলে পায়ে হেটে দিন-রাত মানুষের সেবায় চলা ওই সংগ্রামী নারীর দু:খের সীমা নেই। আত্মসম্মানের ভয়ে কারো কাছে নিজের দু:খের কথা তিনি ভাগ করেন নি।

দু:খ কষ্টকে চাঁপা দিয়ে অদম্য সাহস নিয়ে চলছে তার জীবন। বেঁচে থাকার জন্য তিনি তার পরিবারের হাল ধরেছেন অনেক আগ থেকে। স্বামী ও পুত্রহীন সাত কন্যা নিয়ে চলছে জীবন নামের সংগ্রাম। তিনি সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার ছৈলা-আফজলাবাদ ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামের মৃত আলাউদ্দিনের স্ত্রী।

জানা যায়, ১৯৯৭ সালে প্রথমে তিনি সংরক্ষিত সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে (তারা) প্রতীকে প্রায় ২৯শ’ ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন। তখন তার প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন আরও চারজন নারী। এর পর থেকে তিনি একাধারে চারবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয় লাভ করেছিলেন।

১১ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপে ছাতক উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ছৈলা আফজলাবাদ ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু তার সাথে কোন প্রতিদ্বন্দ্বি না থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি পঞ্চম বারের মতো সংরক্ষিত নারী সদস্য নির্বাচিত হয়ে গৌরব অর্জন করেন।

তার ন্যায় উপজেলায় টানা পঞ্চমবার জয়ের দ্বিতীয় কেউ নেই বলে অনেকের ধারণা। সুখে দু:খে, যে কোন বিপদে-আপদে সহযোগিতা পান বলে তাকে বারবার নির্বাচিত করে আসছেন স্থানীয় ভোটাররা। ভোটারদের কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

একান্ত আলাপকালে সংগ্রামী নারী চন্দ্রমালা বিবি জানান, তিনি ১৯৯৭-২০২১ইং পর্যন্ত প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। প্রথম চার বার তিনি প্রতিদ্বন্দ্বি করে জিতলেও এবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়েছেন। সরকারী বেতনের টাকা দিয়ে চলে তার সংসার।

দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর তার স্বামী মারা যান। সাত কন্যা ছাড়া তার কোন ছেলে সন্তান নেই। অভাবের সংসার তার। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। স্বামী থাকাকালিন সময়ে একমাত্র বাড়িটি ভিটে বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন নেই তার ভিটে-মাটি। তিন বছর ধরে গ্রামের মরহুম ইস্কার লন্ডনীর পরিত্যক্ত রাইছমিলে আশ্রয় নিয়ে থাকছেন।

মানুষের সাহায্যে কন্যাদের বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু স্বামীর নির্যাতন সইতে না পেরে ৫বছর ধরে তিন সন্তান নিয়ে ফের আশ্রয় নিয়েছে প্রতিবন্ধি কন্যা রাহিমা। শেষ বয়সে এসে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিরাপদে বসবাসের জন্য গ্রামে একটুকরো জমিসহ একটি বসতঘরের পাশাপাশি ডিগ্রি পরিক্ষার্থী তার ছোট কন্যা ফাতেমা বেগমকে সরকারী চাকুরী দিয়ে সহযোগিতা করতে স্থানীয় সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি তিনি জোর দাবী জানান।

ছাতক প্রেসক্লাবের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন তালুকদার বলেন, টানা পাঁচ বারের নির্বাচিত সংরক্ষিত এ নারী সদস্যের গুনের কথা ইতি মধ্যে জেনেছেন। সংগ্রামী এ নারী জনসেবায় অনন্য ভূমিকা রাখছেন। এলাকার মানুষ বারবার তাকেই নির্বাচিত করে প্রমান করছেন তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে। নির্লোভ এ ত্যাগী নারী দীর্ঘ দুই যোগ ধরে প্রতিনিধিত্ব করে আসলেও নেই ভিটে-মাটি। অন্যায় পথে টাকা কামাই না করে বেতনের অল্প টাকা দিয়েই তিনি তার সংসার পরিচালনা করছেন। তিনি মনে করেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিৎ পুরস্কার হিসেবে তাকে জমিসহ একটি ঘর উপহার দেয়া।

ছাতক উপজেলা সমাজসেবা অফিসার শাহ মো. শফিউর রহমান বলেন, এলাকায় ওই নারীর বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। এ কারণে মানুষ তাকে ভোট দিয়ে পরপর চারবার সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী সদস্য নির্বাচিত করেছেন। এবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি বলেন, সফলতার সাথে জনপ্রতিনিধিত্ব করা এমন নারী সমাজে বিরল।