• ১৫ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ২রা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ৬ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি

আল—কুরআন : মান ও অপমান

bilatbanglanews.com
প্রকাশিত অক্টোবর ১৬, ২০২১
আল—কুরআন : মান ও অপমান

দার্শনিক কবি আল্লামা ইকবালকে তাঁর ছাত্র বললেন, মানুষ বলে আপনি নাকি জার্মান দার্শনিকদের কাছ থেকে আপনার Philosophy of Self (খুদী দর্শন) গ্রহণ করেছেন। আপনি নিজেই বলে দিন, আপনার দর্শনের উৎস কী? আল্লামা বললেন, কুরআন শরীফ নিয়ে এসো, সুরা হাশশের ১৯ নম্বর আয়াত পড়। এ আয়াতই আমার খুদী দর্শনের উৎস। ছাত্র অবাক! প্রাচ্যের মহাকবি ইকবাল, যিনি ক্যামব্রিজ থেকে আইনশাস্ত্রে ডিগ্রি নেয়ার পর জার্মানি থেকে দর্শনশাস্ত্রে পিএইচডি করেছেন, তিনি তাঁর দর্শন গ্রহণ করেছেন কুরআন থেকে?

[খুদী দর্শন কী এবং ইকবাল সেটি কুরআন থেকে কীভাবে নিয়েছেন, তা বিস্তর আলোচনার বিষয়। এখানে বাদ দিচ্ছি]

১৯৮০ সালে বিশ্বসেরা ভ্রূণ বিশেষজ্ঞ কানাডার প্রফেসর কিথ এল মোর সৌদি আরবে বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রিত হলেন। ওখানে কুরআন শরীফের সাথে তাঁর পরিচয় হলো। সুরা মু’মিনূনের ১২-১৪ নম্বর আয়াত পড়ে তিনি বিস্মিত হয়ে গেলেন। Embryology বা মাতৃগর্ভে শিশুর ভ্রূণ সম্পর্কে এতটা সুক্ষ্ম ও বাস্তব তথ্য কোথাও তাঁর চোখে পড়েনি। দীর্ঘ ১১ বছর তিনি কুরআনের ভ্রুণতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করলেন। একটি তথ্যমতে তিনি ইসলাম কবুল করেছিলেন।

ইরাকের আরবি ভাষাতত্ত্ববিদ ড. ফাদ্বেল সালেহ সামারাঈ ইসলাম সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন। কেউ একজন তাঁকে বলেছিল, কুরআনে ব্যাকরণগত অনেক ভুলভ্রান্তি আছে। তিনি সেগুলো খোঁজার জন্য কুরআন পড়া শুরু করেছিলেন। পরবর্তী জীবন তিনি কুরআনেই সঁপে দিয়েছেন। ভুল তো বের হয়নি, কিন্তু কুরআন তাঁকে ইসলামে নিয়ে এসেছিল।

এরকম লাখো উদাহরণ আছে। জ্ঞানের পিপাসায় জগত চষে বেড়ানোর পর মানুষ কুরআনের মহাসাগরে ডুব দিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করেছে। এ জীবনে কুরআন শরীফ পড়তে গিয়ে আমার মতো তুচ্ছ মানুষ কতবার যে হতবিহ্বল হয়েছি, আল্লাহর কসম, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। বিজ্ঞান, দর্শন, মনস্তত্ত্ব, আইন, ইতিহাস, সমাজবিদ্যা– আল্লাহর কিতাবের প্রাসঙ্গিক আয়াতগুলো আমাকে নাড়িয়ে গেছে। এটি অধম বান্দার প্রতি আমার রবের মহান অনুগ্রহ।

যত দিন যাচ্ছে, এ কিতাব আরও স্পষ্ট হয়ে সামনে আসছে। শরীয়াহ সংক্রান্ত বিষয় রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবিদের যুগেই চূড়ান্ত হয়ে গেছে। তবে কুরআনের জাগতিক জ্ঞান সংক্রান্ত তত্ত্বগুলো প্রতিদিন নতুন করে উদ্ভাসিত হচ্ছে। সাহাবিদের কাছে মহাবিশ্ব সম্পর্কে এত তথ্য ছিল না, যতটুকু আজ আমাদের কাছে আছে। গবেষণা এগুচ্ছে, নতুন তথ্য আসছে। আজ আমরা কুরআনকে চোখ বুজে নয়, বরং চোখ খুলে ইয়াকীন করতে পারি। সুরা ওয়াকিয়ার ৭৫-৭৬ নম্বর আয়াত পড়ে বুঝতে পারি, এখানে ব্লাকহোলের কথা ইঙ্গিত করা হয়েছে। সুরা মা’আরিজের ১৯-২০ নম্বর আয়াত পড়লে ভাবি, আল্লাহ এখানে আমার মানসিক অবস্থার কথা বলছেন। সুরা রা’দ ও ইবরাহীম ভয় দেখায়, সুরা আলে ইমরান ও ইউসুফ মনের কষ্টগুলো দূর করে দেয়। সুরা নিসা, নূর ও আহযাব আইন শেখায়, সুরা বাকারা ও তাওবাহ শেখায় রাষ্ট্রনীতি। সুরা মুযযাম্মিল ও জুম’আ শেখায় প্রস্তুতি, সুরা ফাতহ ও হাদীদ শেখায় দৃঢ়তা, সুরা কাহাফ মজবুত ঢাল হিসেবে কাজ করে, সুরা সফ দেখায় সাফল্য। সুরা হুজুরাত পড়ে মনে হয়, সুন্দর একটি সমাজ গঠনের জন্য এই এক সুরাই যথেষ্ট। মনে পড়ে আমাদের নবী ﷺ এর অমর বাণী-
كِتَابُ اللَّهِ فِيهِ نَبَأُ مَا قَبْلَكُمْ وَخَبَرُ مَا بَعْدَكُمْ وَحُكْمُ مَا بَيْنَكُمْ وَهُوَ الفَصْلُ لَيْسَ بِالهَزْلِ مَنْ تَرَكَهُ مِنْ جَبَّارٍ قَصَمَهُ اللَّهُ وَمَنْ ابْتَغَى الهُدَى فِي غَيْرِهِ أَضَلَّهُ اللَّهُ وَهُوَ حَبْلُ اللَّهِ المَتِينُ وَهُوَ الذِّكْرُ الحَكِيمُ وَهُوَ الصِّرَاطُ المُسْتَقِيمُ هُوَ الَّذِي لَا تَزِيغُ بِهِ الأَهْوَاءُ وَلَا تَلْتَبِسُ بِهِ الأَلْسِنَةُ وَلَا يَشْبَعُ مِنْهُ العُلَمَاءُ وَلَا يَخْلَقُ عَلَى كَثْرَةِ الرَّدِّ وَلَا تَنْقَضِي عَجَائِبُهُ
“আল্লাহর কিতাব, যাতে তোমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের সংবাদ এবং তোমাদের জন্য সমাধান রয়েছে। এটি সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। এটি কোনো ঠাট্টার বিষয় নয়। যে অহংকারবশত একে ত্যাগ করবে, আল্লাহ তাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবেন। যে কুরআন ব্যতীত অন্য কোথাও হিদায়াত খুঁজবে, আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করে দেবেন। এটি আল্লাহর মজবুত রশি, এটি প্রজ্ঞাময় যিকর, এটিই সিরাতুল মুস্তাকীম। এটি অনুসরণ করলে প্রবৃত্তি বিপথগামী হবে না। এটি পড়তে জিহ্বা আড়ষ্ট হবে না। জ্ঞানীরা এর থেকে (জ্ঞান আহরণ করতে করতে) তৃপ্ত হবে না, বারবার তিলাওয়াত করলেও এটি পুরাতন হবে না এবং এর আজাইব (নিগূঢ় ও বিস্ময়কর রহস্য) কখনও শেষ হবে না।” [তিরমিযী, ২৯০৬]

মানবজাতি বুঝতেই পারেনি, তারা কি নিয়ামাত পেয়েছে। বাকিরা কী বুঝবে, মুসলমানরাই আজ পর্যন্ত বুঝতে পারল না। নইলে নিজে শিখত, দুনিয়াকেও শেখাত। মুসা আলাইহিস সালামের লাঠি সাপ হয়ে গেছে শুনে আমরা বিস্ময়ে বাঁচি না। অথচ এরচেয়ে হাজারগুণ বড় মু’জিযা আমরা বগলদাবা করে বসে আছি, খুলেও দেখি না। যে কিতাব এসেছিল মুর্দাকে যিন্দা করার জন্য, আমরা সেটিকে মুর্দার কুলখানি করার জন্য তুলে রেখেছি। যেন এটিই কুরআনের একমাত্র কাজ! অথচ যার কলবে কুরআন নাযিল হয়েছে, তিনি ﷺ বলেছেন-
إِنَّ اللهَ يَرْفَعُ بِهَذَا الْكِتَابِ أَقْوَامًا وَيَضَعُ بِهِ آخَرِينَ
“আল্লাহ এ কিতাবের দ্বারা কিছু জাতিকে ওপরে তুলবেন এবং এ কিতাব (ছেড়ে দেয়ার) কারণে কিছু জাতিকে লাঞ্ছিত করবেন।” [সহীহ মুসলিম, ৮১৭]

আজ এ লাঞ্ছনা সইতে হচ্ছে মুসলমানদেরকে। আজ কেউ মূর্তির পায়ে কুরআন রেখে দেয়, কেউ কুরআনের পাতা ছিড়ে ফেলে, কেউ জ্বালিয়ে দেয়। আমরা ব্যথিত, রাগান্বিত হই। অবশ্যই হওয়া উচিৎ। সাথে কি একবার ভাবি যে, এরা এগুলো কেন করে? কুরআনকে অপমান করার জন্য? কিন্তু কুরআন অপমানিত হচ্ছে না। অপমানিত হচ্ছে মানবজাতি, যাদেরকে আল্লাহ কুরআন দিয়েছিলেন। অথচ তারা এমন ভাব করল, যেন গাধার পিঠে কিতাবের বোঝা!

পৃথিবীতে ইসলাম কবুল করার সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে, বিশেষত পশ্চিমা বিশ্বে। এটি কোনো রাহমাতুল্লাহ, হাফিজাহুল্লাহ কিংবা আয়াতুল্লাহ’র কারণে নয়। এই কুরআনের কারণে। কুরআন নিজেই তাঁর দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা আমাদের নবীর কাছ থেকে কুরআন পৌঁছে দেয়ার যে দায়িত্ব নিয়েছি, তাতে যদি আমরা Equal to the task প্রমাণিত না হই, তাহলে কিয়ামাতের দিন মূর্তির পায়ে কুরআন রাখা এই অমানুষটাই আল্লাহর কাছে আমাদের বিরুদ্ধে ফরিয়াদি হয়ে দাঁড়াবে। বলবে, “আল্লাহ, এরা তোমার কিতাব বগলে নিয়ে বসেছিল। আমাদেরকে কুরআন শেখায়নি, এর মর্যাদাও বুঝায়নি। নিজেরা এর ওপর চলেনি, আমাদেরকেও চালায়নি। একটি ইঞ্চি জায়গায় কুরআনের মডেল বাস্তবায়ন করে দেখাতে পারেনি।” এরচেয়ে বড় লজ্জা আর কী হতে পারে?

FOOD FOR THOUGHT