• ১৮ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৫ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ৯ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি

গাড়িচাপায় কানাডায় মুসলিম পরিবারের ৪ জনকে হত্যা, ঘাতক গ্রেফতার

bilatbanglanews.com
প্রকাশিত জুন ৮, ২০২১
গাড়িচাপায় কানাডায় মুসলিম পরিবারের ৪ জনকে হত্যা, ঘাতক গ্রেফতার

লাবলু আনসার:কানাডায় পাকিস্তানী এক মুসলিম পরিবারের ৪ জনকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মুসলিম হওয়ায় তাদের হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই পরিবারের একজন সদস্য হামলা থেকে বেঁচে গেছে। ৯ বছর বয়সী ওই শিশু এখন হাসপাতালে।

তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক। এদিকে এ ঘটনায় ২০ বছর বয়েসী হামলাকারী নাথানিয়েল ভেল্টম্যানকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
এ ঘটনায় নিহতরা হলেন সাঈদ আফজাল (৪৬) এবং তার স্ত্রী মাদিহা সালমান (৪৪), আফজালের মা (৭৪) এবং আফজাল-মাদিহা দম্পতির কন্যা ইয়ুমনাহ আফজাল (১৫)। এই দম্পতির একমাত্র পুত্র ফায়েজ আফজাল (৯) নিকটস্থ হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

অন্টারিয়ো প্রদেশের লন্ডন সিটির মেয়র এড হোল্ডার এবং সিটি পুলিশের প্রধান স্টিভ উইলিয়ামস পৃথকভাবে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলকভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে এবং এটি মুসলিম-বিদ্বেষ থেকে সুপরিকলিপ্ত একটি হত্যাযজ্ঞ। এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ এবং হতাহতদের জন্যে দুঃখ প্রকাশ করে এক টুইট বার্তায় কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো লিখেছেন, ‘অন্টারিয়ো প্রদেশের লন্ডনের খবর শুনে আমি মর্মাহত। রবিবারের ঘৃণিত ঘটনায় যারা প্রিয়জনদের হারিয়েছেন, আমরা তাদের পাশে আছি। আমরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুটির পাশেও আছি।

তার জন্য আমার হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে। সুস্থ হয়ে উঠলে তুমি আমাদের অন্তরে ঠাঁই পাবে। ’
হামলার তীব্র নিন্দা ও নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অন্টারিয়ো প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ডগ ফোর্ড টুইটারে লিখেছেন, ‘ঘৃণা ও ইসলামবিদ্বেষের কোনো স্থান অন্টারিয়োতে নেই। ’ লন্ডন শহরের মেয়রও এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

হামলাকারি ভেল্টম্যান গ্রিণ লাইটের অপেক্ষায় থাকা পরিবারটিকে চাপা দিয়েই দ্রুতবেগে তার পিকআপ ট্রাক চালিয়ে সটকে পড়তে চেয়েছিল।

অকুস্থল থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূর একটি শপিং মলের পার্কিং লট থেকে তাকে পুলিশ গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। গ্রেফতারের সময় ভেল্টম্যান কোন বাদানুবাদ করেনি। ট্রাকটিও পুলিশের কব্জায় রয়েছে।
পুলিশ কমিশনার উইলিয়ামস সোমবার সন্ধ্যায় আরো জানিয়েছেন, ‘আমরা বিশ্বাস করছি যে, সেটি ছিল পরিকল্পিত একটি হামলা এবং মুসলমান বলেই পরিবারটি এমন নিষ্ঠুর হামলার শিকার হয়েছেন। ’ তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের ডিটেকটিভ পোল ওয়েইট বলেছেন, পরিবারের সকলেই রাস্তা অতিক্রমের জন্যে হাইড পার্ক রোড এবং সাউথ ক্যারিজ রোডের ইন্টারসেকশনে দাঁড়িয়েছিলেন। সিগন্যালে গ্রীণলাইট জ্বলে উঠার অপেক্ষায় থাকাবস্থায় উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে কালো রংয়ের পিকআপ তাদের ওপর হামলে পড়ে। চাপা দিয়েই সটকে পড়েছিল পিকআপটি। তবে কীভাবে পিকআপ ট্রাকের ড্রাইভার ভেল্টম্যানকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং কয়েক ঘন্টার মধ্যেই বাণিজ্যিক কেন্দ্রের পার্কিং লট থেকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে তা বিস্তারিতভাবে জানাননি তদন্ত কর্মকর্তারা।

উল্লেখ্য, গত ২০১৭ সালে কানাডার কুইবেক সিটির একটি মসজিদে ঢুকে এক বন্দুকধারি নামাজরত ৬ মুসল্লীকে গুলি করে হত্যা করেছিল। সেই ধর্মীয় বিদ্বেষী আক্রমণের পর এটি হচ্ছে একইধরনের বিদ্বেষমূলক হামলার দ্বিতীয় ঘটনা। লন্ডনের মেয়র হোল্ডার বলেন, গ্রেফতারকৃত তরুণ এর আগে কোন ধরনের অপরাধে কখনো গ্রেফতার হয়নি অথবা চিহ্নিত কোন অপরাধ চক্রের সদস্য বলেও তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন না। অভিযুক্ত ঘাতককে বৃহস্প্রতিবার পুনরায় আদালতে হাজির করার কথা।

নিহত পরিবারের দাফন-কাফনের খরচ বহনের জন্যে ওয়েবসাইটে তহবিল সংগ্রহের যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ভিকটিমদের মধ্যে ৪৬ বছর বয়েসী সাঈদ আফজাল ছিলেন ফিজিয়োথেরাপিস্ট এবং ক্রিকেট খেলার ভক্ত। তার স্ত্রী মাদিহা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবি এবং ওন্টারিয়োর ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করছিলেন। ইয়ুমনাহ এ বছরই নবম গ্রেডে গ্র্যাজুয়েশন করেছে। প্রবীনতম মহিলাটি ছিলেন গোটা পরিবারের অভিভাবক, তার নাম পুলিশ নিশ্চিত করতে পারেনি।

এই পরিবারের ঘনিষ্ঠজন জাহিদ খান বলেন, দাদি, পিতা, মাতা এবং টিনেজ কন্যা অর্থাৎ তিন প্রজন্মের সকলকেই টার্গেট করা হয়েছিল নি:শেষ করতে। ১৪ বছর আগে তারা পাকিস্তান থেকে নিরাপদ ও উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় কানাডায় এসে বসতি গড়েছিলেন। লন্ডন মসজিদের নিয়মিত সদস্যও ছিলেন সকলেই। উল্লেখ্য, এই সিটির মোট জনসংখ্যা ১০ ভাগই মুসলমান। জাহিদ খান পরিবারের হতভাগ্য সদস্যগণের স্মৃতিচারণকালে আরো বলেন, ‘আমি পাকিস্তান থেকে কানাডায় আসার পরই এই পরিবারের সাথে মিলিত হয়েছি। তাদের পরামর্শে লন্ডন সিটিতে বাড়ি ক্রয় করি।

লন্ডন মসজিদের কর্মকর্তা নাওয়াজ তাহির বলেন, ঘটনাটি গোটা মুসলিম কমিউনিটিতে আতংকের বিস্তার ঘটিয়েছে। ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা যে এভাবে টার্গেটে পরিণত হয়েছি, এই নৃশংসতার মধ্যদিয়ে তার প্রকাশ ঘটলো। অথচ এই সমাজে আমরা পরস্পরের বন্ধু-সতীর্থ বলেই মনে করি। এমনি অবস্থায় একটি পরিবারকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার ঘটনায় সকলেই হতভম্ব এবং আতংকগ্রস্ত। এমন বিদ্বেষী মনোভাবাপন্নদের বিরুদ্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হবার আহবান জানিয়েছেন নাওয়াজ।

‘দ্য ন্যাশনাল কাউন্সিল অব কানায়িান মুসলিম’র প্রেসিডেন্ট মোস্তফা ফারুক বলেছেন, কানাডায় এটি সন্ত্রাসী হামলা। সন্ত্রাস হিসেবেই এটিকে বিবেচনা করতে হবে এবং প্রশাসনকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। হামলাকারিকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তদন্ত কর্মকর্তারা বলেছেন যে, হামলাকারির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ধর্মীয় বিদ্বেষের প্রসঙ্গও রয়েছে মামলায়।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী টুইটে আরো উল্লেখ করেছেন, ‘লন্ডনসহ গোটা কানাডার মুসলিম সম্প্রদায়কে জানাতে চাই যে, আমরা তোমাদের পাশে আছি। আমাদের সমাজে ইসলাম বিদ্বেষের কোন ঠাঁই নেই। এমন ঘৃণা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এটিকে অবশ্যই থামাতে হবে। ’ ডেমক্র্যাটিক পার্টির নতুন নেতা জগমিৎ সিং অপর টুইটে বলেছেন, ইসলাম-বিদ্বেষের ঠাঁই নেই কানাডায়। আর এটি হচ্ছে সন্ত্রাস। তাই অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তি হতে হবে।(বিডি প্রতিদিন)