• ২৯শে নভেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ , ৫ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি

মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন ও আমার উপলব্ধি

bilatbanglanews.com
প্রকাশিত মার্চ ১২, ২০২১
মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন ও আমার উপলব্ধি

মোহাম্মদ রহিম উদ্দিন তালুকদার:আমি শিশুকাল থেকেই সহজাতভাবে কোন কিছু শেখার জন্য মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করতাম। এখনও চেষ্টা করি নতুন কোন কিছু শেখার। শিক্ষার কোন বয়স হয় না। আমার আগ্রহ আছে এমন বিষয়ের প্রতি আমি সবচেয়ে বেশি সময় দেয়ার চেষ্টা করি। ক্লাস সিক্স পর্যন্ত প্রাইমারি স্কুলে পড়ার পর আমার আব্বা আমাকে মাদ্রাসায় পড়িয়ে আলেম বানানোর স্বপ্ন দেখেন। সেজন্য হাইস্কুলে ভর্তি না করিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয়। প্রাইমারিতে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়লেও মাদ্রাসায় ক্লাস থ্রি-র সমপর্যায়ে ভর্তি করানো হয়। বাংলা আর গণিত পড়তে কোন সমস্যা না হলেও আরবি ও ফার্সি পড়তে পারতাম না। আর মাদ্রাসায় বাংলা ও গণিতের প্রতি কোন গুরুত্ত্ব দেয়া হতো না। এগুলো পারা না পারা সমান ছিলো। শুধু আরবি ও ফার্সিকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হতো। সেজন্য ভর্তি হওয়ার পর প্রথম তিন দিন যে বেত্রাঘাত খেয়েছিলাম তা আমি আমার জীবনেও ভুলব না। প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ অবধি আমি পড়াশোনার জন্য আমার কোন কথাই শুনতে হয়নি। সেই তিনদিন ঔ মাদ্রাসায় যাওয়ার পর আমি আর মাদ্রাসাতে যাইনি। পরের বছর আবার আরেকটা মাদ্রাসাতে ভর্তি করানো হয়। সেখানে একই অবস্থা। মনে আছে পাঁচ-ছয় দিন যাওয়ার পর আর যাওয়া হয়নি। তখন ছোট থাকলেও মনে হতো এভাবে পড়াশোনা করানো বা করা কোন ভাবেই ঠিক নয় উচিতও নয়। আব্বাকে একদিন বলি আমি আলেম না হতে পারি কোনদিন জালেম হবো না। এমন কোন কাজ স্বজ্ঞানে করব না যাতে তোমাকে কেউ গালি দেয়। তার পরের বছর আমার জোরাজুরিতে হাই স্কুলে ভর্তি করাতে বাধ্য হোন।
ক্লাস সিক্স পর্যন্ত আমি ক্লাসের সবচেয়ে পিচ্চি ছেলেদের অন্যতম ছিলাম৷ সিক্সে পড়াকালীন কেউ বিশ্বাসই করতো না আমি সিক্সে পড়ি। কিন্তু সেভেনে প্রথম ক্লাসে যাওয়ার দিন আমার সিক্সে পরা পেন্ট পরতে পারি না। তখন হঠাৎ করে সেভেন ক্লাসের সবচেয়ে লম্বাদের একজন হয়ে গেলাম। তখন আমার ক্লাসের কয়েকজন ভাই বলে ডাকতো। আর সত্যিই তো আমি তাদের থেকে দুই বছরের সিনিয়র। ভাই ডাক শুনতে খারাপ লাগতো না। সিক্সে ছোট গ্রুপে উচ্চ লাফ, দীর্ঘ লাফ, ১০০ মিটার ও ২০০ মিটার দৌড়ের ট্রায়ালে প্রথম হওয়ার পরও নিজেকে ছোট মনে করে ফাইনালের দিন কোন খেলাতে অংশগ্রহণই করিনি। সেভেনে উঠে আমি বড়দের দলে খেললেও কোনোটিতেই আমি কখনও ফার্স্ট ছাড়া সেকেন্ড হই নি। সেজন্য এসএসসি যে বছর দেই সে বছর আর খেলতে দেওয়া হয়নি। মফস্বল এলাকায় প্রচলিত সকল খেলায় পারঙ্গম ছিলাম। একে তো লম্বা হ্যাঙলা পাতলা তার উপর খেলা ধুলায় ভালো তাই আব্বার স্বপ্ন তৈরি হলো আমাকে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করানোর। সিক্স থেকে ইন্টার পর্যন্ত চুল শুধু সেনাবাহিনী স্টাইলে কাটতে হতো। তবে সেনাবাহিনীর প্রতি আমার বিন্দু মাত্র আগ্রহ তৈরি হয় নি। ইন্টারে পড়াকালীন একদিন এক সেনা সদস্যের সাথে ঝগড়া পর্যন্ত করেছিলাম। আমি এমসি কলেজে ভর্তি হলেও আমার অধিকাংশ বন্ধু ছাতক ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হয়েছিলো। তাই বাড়িতে গেলে ছাতক কলেজে যেতাম। একদিন যাওয়ার পর দেখি সেনাবাহিনীতে ভর্তির বিষয়ে একটা সেমিনার হচ্ছে। আমিও সেখানে অংশগ্রহণ করি। আমি পেছনের দিকে বসে পত্রিকা পড়ছিলাম। একজন সেনা সদস্য আমার পত্রিকা কেড়ে নেয়। আমি দিয়েও দেই। বলি আমি যাওয়ার সময় আমার পত্রিকা দিয়ে দিবেন। আমি সেমিনার শেষ না করে চলে আসার সময় তার কাছে পত্রিকা চাই। সে আমাকে পত্রিকা তো দেয়ইনি বরং রুমে চুপ করে বসে থাকতে বাধ্য করে। আমি কোনভাবেই বসতে রাজি না হওয়ায় প্রিন্সিপাল ও মেজরকে ডেকে আনে। আমিও নাছোড়বান্দার মতো তার সাথে কথা কাটাকাটি করি। পরে প্রিন্সিপাল ও মেজর এসে আমাকে পরিচয় দিতে বলে। আমি আমার পরিচয় দেই ও আমার পত্রিকা আমাকে দেয়ার জন্য বলি। কেনো সেমিনারে এসেছি সেটাও বলি। প্রিন্সিপালসহ সব ছাত্র মেজরের কাছে ক্ষমা চাইতে বলে। আমি কোনভাবেই ক্ষমা চাইনি। পরে আমি পত্রিকাসহ কলেজ ক্যাম্পাস ত্যাগ করি। তারপর সেনাবাহিনীর প্রতি কোন প্রকার আগ্রহ কি জানার পর্যন্ত ইচ্ছা কাজ করেনি। তাই ইন্টার পাস করে আব্বাকে রাজি করাই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বো। তখন আব্বার কথা ছিলো অন্তত কাস্টমস অফিসার যেনো হই। তখনও আমি বলি অফিসার হতে পারবো কিনা জানি না তবে তোমার অসম্মান হয় এমন কাজ কোনদিন করবো না।
এতোগুলো কথা বলার অর্থ হলো আগ্রহ থাকলে যেকোন কিছুতে ভালো করা যায়। মেরে ধরে, বেত্রাঘাত করে কিছু হয় না। হলেও সেটা টেকসই কোন কিছু না। স্কুল কলেজে সরকার বেত নিষিদ্ধ করেছে। শরীরে আঘাত করা কোন ভাবেই মানবিক হতে পারে না। আর যারা অন্ধের মতো বিশ্বাস করেন শিক্ষা গুরুর আঘাত উপকারী বা স্বর্গ প্রাপ্তিতে সহায়তা করে চরম প্রকারের বোকামি। কারণ স্বর্গে মানুষের পার্থিব শরীর যাবে না। তাই আসুন শিশু কাল হোক আর শিক্ষা জীবনের শেষকাল হোক সকল প্রকার শারিরীক নির্যাতনের প্রতিবাদ করি, প্রতিরোধ করি। শিশুর মানসিক বিকাশে সহায়তা করি।

লেখক: জেলা সমবায় কর্মকর্তা, জেলা সমবায় কার্যালয়,মৌলভীবাজার।

স্থায়ী ঠিকানা: গ্রামঃ বারকাহন,ইউপি নোয়ারাই,

ছাতক।