• ২৮শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ , ১৪ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২৫শে জমাদিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

হানাদার মুক্ত সিলেট — অকুতোভয় দুই মুক্তিযোদ্ধার সাহসের গল্প

bilatbanglanews.com
প্রকাশিত ডিসেম্বর ১২, ২০২০
হানাদার মুক্ত সিলেট — অকুতোভয় দুই মুক্তিযোদ্ধার সাহসের গল্প

হানাদার মুক্ত সিলেট
——————————
অকুতোভয় দুই
মুক্তিযোদ্ধার
সাহসের গল্প
অজয় পাল:গল্পটি তেরো ডিসেম্বর একাত্তর সালের । ছয় ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার পর ভারতীয় মিত্রবাহিনী সিলেট শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রচন্ড বিমান হামলা শুরু করে । এসময় গেরিলা তৎপরতা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চোরাগুপ্তা হামলাও সমান্তরাল ভাবে চলতে থাকায় পাকসেনা ও তাদের দোসররা প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং পাকি-দের কয়েকটি ঘাঁটিরও পতন ঘটে । এরই মধ্যে তেরো ডিসেম্বর পাকবাহিনী হঠাৎ করে পাল্টা বিমান হামলা শুরু করলে মুক্তি ও মিত্রবাহিনী সড়ক পথে বিনা যুদ্ধে সিলেট দখলের প্রস্তুতি নেয় । এর আগে বারো ডিসেম্বর জৈন্তাপুরের দরবস্ত এলাকায় অবস্থান নেয়া
মুক্তিযুদ্ধের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তথা ৪ ও ৫নম্বর সেক্টরের বেসামরিক প্রধান , তৎকালীন জাতীয় পরিষদ সদস্য দেওয়ান ফরিদ গাজী, মিত্র বাহিনীর অধিনায়ক কর্নেল বাগচী এবং ৪ নম্বর সেক্টর কমান্ডার সি আর দত্ত সিলেটের মানচিত্র নিয়ে বসে উল্লেখিত সিদ্ধান্তের ছক কষেন । সে অনুযায়ী তেরো ডিসেম্বর পাকসেনাদের বিমান হামলা উপেক্ষা করে মুক্তিবাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্যকে সাথে নিয়ে এগিয়ে এসে তাঁরা অবস্থান নেন সিলেট শহরের পূর্ব দিকে খাদিমনগরে । একই সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আরো দুটি দল অবস্থান নেয় দক্ষিণ-পশ্চিমে জালালপুর এবং লামাকাজী এলাকায় । একমাত্র উত্তর দিক ছিলো উন্মুক্ত । বিস্তীর্ণ সীমান্ত ও পাহাড়ি এলাকা থাকায় সেদিকে পাকবাহিনীর পালানোর সকল পথ ছিলো রুদ্ধ । ইতোমধ্যে এমসি কলেজ থেকে পাক বাহিনী তাদের ক্যাম্পটি গুটিয়ে নেয়নি , এমন খবর চলে আসলে এদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করার প্রস্তুতি নেয়া হয় দুপুরের দিকে । হরিপুর গ্যাস ফিল্ড , টিলাগড়স্থ বেতার কেন্দ্র ও এমসি কলেজ সহ অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে আশঙ্কায় যুদ্ধ অর্থাৎ লড়াইয়ের পরিকল্পনা বাদ দেয়া হয় । সে অনুযায়ী দুজন অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধার প্রয়োজন অপরিহার্য হয়ে ওঠে , যারা গাড়ীতে মাইক বেঁধে পাকবাহিনীর ক্যাম্পে পৌঁছে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাবে। হাত উঁচিয়ে স্বেচ্ছায় এগিয়ে এলেন দুই মুক্তিযোদ্ধা । জীবনের উপর মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে আসা এই দুই মুক্তিযোদ্ধার একজন দেওয়ান ফরিদ গাজীর দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গী ফোরকান আলী ( কুটু মিয়া ) , অপরজন টগবগে যুবক আনোয়ার হোসেন গোরা । অল্পক্ষণের মধ্যেই গাড়িতে মাইক বেঁধে তাঁরা পৌঁছে গেলেন এমসি কলেজে পাক সেনাদের ক্যাম্পে । মাইকে উপর্যুপরি আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানোর এক পর্যায়ে কয়েকজন পাকসেনা এগিয়ে এসে তাঁদের আটক করে জীপ সহ ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালাতে থাকে । তাঁরা তখন পাকসেনাদের জানিয়ে দেন যে , মুক্তি ও মিত্রবাহিনী তোমাদের কাছাকাছি অবস্থানে । আমাদের হত্যা করলে পরিণতি ভয়াবহ হবে , বরং তোমরা আত্মসমর্পণ করো । তখন হঠাৎ কি ভেবে যেনো দুজনকেই তারা প্রায় দুঘন্টা পর গাড়ী নিয়ে চলে যেতে বলে । জবাবে তাঁরা বলেন , তোমরা কি পেছন থেকে আমাদের গুলি করতে চাচ্ছো ? ক্যাম্প ইনচার্জ বলে , নাহ্ , তোমরা নির্ভয়ে যাও । মিত্রবাহিনীকে বলে দিও , আমরা আপার লেভেলে যোগাযোগ করে আমাদের সিদ্ধান্ত জানাবো । প্রাণ নিয়ে ফিরে এসে দুই মুক্তিযোদ্ধা আদ্যপান্ত জানালে পরদিন চৌদ্দ ডিসেম্বর বিকেলের দিকে মুক্তি ও মিত্রবাহিনীকে সাথে নিয়ে দেওয়ান ফরিদ গাজী , সি আর দত্ত ও কর্নেল বাগচী শহর অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন । এদিকে অবস্থা বেগতিক দেখে আগের রাতেই পাকবাহিনী এমসি কলেজের ক্যাম্প গুটিয়ে নিয়ে সালুটিকর বিমানঘাঁটিতে চলে যায় । যাবার আগে তারা ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে যায় সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কীনব্রিজটি । এদিকে সিলেট অভিমুখী যাত্রার অংশ হিসেবে আনোয়ার হোসেন গোরা ও কুটিম আলীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের আরো দুটি দল সালুটিকর বিমান ঘাঁটি পর্যন্ত ঘুরে আসে । মিত্র বাহিনীর একটি দল অবস্থান নেয় আলুরতলে সরকারী দুগ্ধ খামারের কাছে । এরই মাঝে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে । চারদিক থেকে স্রোতের মতো সিলেট শহর অভিমুখে মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর আগমন ঘটতে থাকে । এদের সাথে যুক্ত হন মুক্তিকামী আপামর জনগণ । জয়বাংলা স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে সিলেট নগরী । হানাদার মুক্ত সিলেটের জনগণ আনন্দে সেদিন রাতে দুচোখের পাতা আর এক করতে পারেন নি । পরদিন পনেরো ডিসেম্বর সিলেটকে মুক্তাঞ্চল হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয় । ইতোমধ্যে পাকবাহিনীর দোসর আলবদর , রাজাকার , আল-সামশ ও শান্তি বাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্টরা আত্মগোপনে চলে যায় ।
সিলেটকে মুক্ত করার সেদিনের অভিযাত্রায় অগণন মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর অবদান আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সন্দেহাতীতভাবে সমৃদ্ধ করলেও সেই দুজন মুক্তিযোদ্ধা , কুটিম আলী ও আনোয়ার হোসেন গোরা’র কীর্তিকে আমি একটু এগিয়েই রাখছি । কতটুকু সাহসী হলে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে হানাদারদের ডেরায় চলে যেতে পারেন দুই বীর , ভাবতেই আজো আমি অবাক হই । অথচ এই দুই বীরকে আজ আমরা ভুলতে বসেছি । সাম্প্রতিক সময়ে অনেক সংবাদকর্মীকে সিলেট মুক্ত দিবস সম্পর্কে লিখতে দেখেছি । তারা নিজেদের প্রতিবেদনে এই দুই মুক্তিযোদ্ধার নাম উল্লেখ না করে “অজ্ঞাতনামা দুই মুক্তিযোদ্ধা ” শব্দটি ব্যবহার করেছেন ,যা কিনা নিতান্তই দুঃখজনক । সিলেট নগরীর সুবিদবাজার নিবাসী কুটিম আলী প্রয়াত হয়েছেন “৯৫ সালের ২৩ অক্টোবর আর জালালাবাদ আবাসিক এলাকা নিবাসী আনোয়ার হোসেন গোরা লোকান্তরিত হয়েছেন ২০০৬ সালের ১২ মে । ব্যক্তি জীবনে দুজনই ছিলেন খুবই সমাজ-বান্ধব এবং নগরীর পরিচিত মুখ । গোরা ছিলেন সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ । গানের কন্ঠ ছিলো অপূর্ব । চমৎকার করে গাইতেন : “তোমরা ভুলে গেছো মল্লিকাদির নাম ” গানটি । প্রয়াত চিত্রনায়ক জাফর ইকবালের খুব নিকটজন ছিলেন এই আনোয়ার হোসেন গোরা ।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের গর্বিত ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত এই দুই বীর সর্বমহলে যথাযথ সম্মানিত হবেন , এ আমার প্রত্যাশা ।

কুটিম আলী ও আনোয়ার হোসেন গোরা । বিদেশী পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিতে ছোট বৃত্তে কুটিম আলি এবং বড় বৃত্তে আনোয়ার হোসেন গোরা ।

লেখক:বিশিষ্ট সাংবাদিক,কলামিস্ট ।

যুক্তরাজ্য।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •