• ৯ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২৪শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৫ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

‘স্বপ্ন’ পুড়ে নিঃস্ব হবিগঞ্জের ১২ তরুণ উদ্যোক্তা

bilatbanglanews.com
প্রকাশিত নভেম্বর ১৩, ২০২০
‘স্বপ্ন’ পুড়ে নিঃস্ব হবিগঞ্জের ১২ তরুণ উদ্যোক্তা

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি :: ছোটবেলা থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন ছিল হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার তরুণ সেন্টু আহমেদ সিহানের। কিন্তু নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের এই স্বপ্নবাজ তরুণের সাদ থাকলেও যে সাদ্য ছিল কম। তাই সেই স্বপ্ন পূরণ নিয়ে ছিল ধোঁয়াশা। এসএসসি পাশ করার পর ২০১৪ সালে মা-বাবার কাছ থেকে ৩০ হাজার আর এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে দেড় লাখ টাকার পূঁজিতে অবশেষে স্বপ্নের বীজ বপন করেন তিনি।

হবিগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের হাওর অঞ্চলিয় উপজেলা আজমিরীগঞ্জ বাজারে ‘সেবিনা রেফিজেরেটর’ নামে একটি মেশিনারীজ পার্টসের দোকান শুরু করেন তিনি। অল্প পূঁজি, তাই সামান্য মালামাল নিয়েই সেই স্বপ্নের যাত্রা। ২০১৪ সাল থেকে দীর্ঘ ৬ বছরে তিল তিল করে শ্রম-ঘাম দিয়ে বড় করে তুলেছেন প্রতিষ্ঠানটি। ক্ষেতের ফসল, গরু-ছাগল বিক্রি করে বাড়িয়েছেন পূঁজি। এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরেই ছিল সব স্বপ্ন। ছোট দুই বোনের লেখাপড়া, বিয়ে। ৫ সদস্যের পরিবারটির বেঁচে থাকার অবলম্বনও ছিল এটি।
সবেমাত্র ব্যবসা থেকে তিনি লাভে মুখ দেখতে শুরু করেছেন। কিন্তু শুরু আগেই পুড়ে ছাই হয়ে গেল স্বপ্নের ‘সেবিনা রেফিজেরেটর’। সর্বনাশা আগুনে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব সেন্টু এখন পাগলপ্রায়।

তেমনই আরেক ব্যবসায়ি সুরনজিত দেবনাথ। অনেক কাটখড় পুড়িয়ে একই সাথে দিয়েছিলেন ‘ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ’ নামে একটি মোটর সাইকেল সার্ভিসিং ও মেকানিকের দোকান। সম্প্রতি ব্রাক থেকে ঋণ নিয়ে বড় করেছেন প্রতিষ্ঠান। দোকানে তুলেছেন সোটরসাইকেলের বিভিন্ন পার্স। এখনও ঋণের টাকা পরিশোধ হয়নি। এরই মধ্যে আগুণে সবকিছু শেষ।

শুধু সেন্টু বা সুরনজিত নয়। মাত্র ২ ঘন্টার আগুণে পুড়েছে সফিকুল মিয়া, আশুতোষ দেব, রাঙ্কু সুত্রধর, অজিত সুত্রধরসহ ১২ জন তরুণ ভ্যবসায়ির স্বপ্ন।

গত ৯ নভেম্বর সোমবার বিকাল ৩টায় আজমিরীগঞ্জ সদরের লালমিয়া বাজারে লাগা আগুনে নিঃস্ব হয়েছেন ১২ জন তরুণ উদ্যোক্তা। সেইদিন বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে লাগা আগুনে ক্ষতি হয়েছিল অন্তত অর্ধকোটি টাকার। সর্বস্ব হারিয়ে এখন তারা পাগল প্রায়। এর আগে গত ১৯ সেপ্টেম্বর উপজেলার পাহাড়পুর বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ওই বাজারের ৩৯টি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এতে অনুমানিক প্রায় ৩০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়।

আজমিরীগঞ্জ উপজেলাটি প্রত্যন্ত হাওর অঞ্চলের একটি জেলা। এক সময় নৌকা দিয়ে জেলা সদরসহ সারাদেশে যাতাযাতই ছিল উপজেলারবাসীর একমাত্র ভরসা। তখনই আজমিরীগঞ্জে গড়ে উঠে হাওর অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় ‘গঞ্জ’। এমনকি স্থানীয়ভাবে সেই গঞ্জকে ‘ভাটি বাংলার রাজধানী’ বলা হতো। এখানে সওদা করতে আসতেন পাশ্বর্তী জেলা কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের অনেক গ্রামের মানুষ। কিন্তু সেখানে এখনও প্রতিষ্ঠা হয়নি কোন ফায়ার সার্ভিস স্ট্রেশন। ফলে সেখানে ছোটখাট অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটলেই ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ ব্যবপক আকারণ ধারণ করে।

স্থানীয়দের দাবি, উপজেলায় কোন ফায়ার সার্ভিস স্ট্রেশন না থাকার কারণে অল্প আগুণই নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যায়। স্থানীয়রা আপ্রাণ চেষ্টা করেও আগুণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। যতক্ষণে আগুণ নিয়ন্ত্রণ হয় ততোক্ষণে সবপুড়ে ছাই হয়ে যায়। হবিগঞ্জ জেলা শহর থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে শুধু ছাই পান।

স্থানীয় ব্যবসায়ি পলাশ মিয়া বলেন, ‘আজমিরীগঞ্জ শুধু একটি উপজেলা নয়। হাওর অঞ্চলের উন্নয়নওে জন্য এটিকে পৌরসভায় রূপান্তর করা হয়েছে। কিন্তু এখানে জনগুরুত্বরপূর্ণ ফায়ার সার্ভিস স্ট্রেশন নাই। যে কারণে সামান্য আগুণ লাগলেই ক্ষয় ক্ষতি হয় ব্যাপক।’

আমির হামজা বলেন, ‘প্রায় ২ লাখ মানুষের বাস এই উপজেলায়। হাওরের উপজেলা হওয়ায় এখানে অধিকাংশ দোকান ঘরই কাটের তৈরী। ফলে সহজেই আগুণ ছড়িয়ে যায়। প্রতি বছরই আগুণ লেগে নিঃম্ব হতে হয় এখানের ব্যবসায়িরা। তাই এখানে দ্রুত একটি ফায়ার সার্ভিসের স্ট্রেশন নির্মাণ জরুরী।’

রুবেল মিয়া নামে এক ব্যবসায়ি বলেন, ‘প্রতি বছর এখানের ব্যবসায়িদের আগুণের সাথে লড়াই করে বাঁচতে হয়। বিড়ি-সিগারেটের আগুণ থেকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয় পুরো বাজার।’

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মতিউর রহমান খাঁন বলেন, ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়িদের সহযোগিতার চেষ্টা চলছে। এছাড়া আজমিরীগঞ্জে একটি উপজেলা নির্মাণের অনুমোদন হয়েছে। কিন্তু জায়গা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সেটি আটকে আছে। আমা করি দ্রুত এর সমাধান হবে।’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •